বঙ্গোপসাগরের গভীরে মাছ ধরার ট্রলারডুবির এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো সন্ধান মেলেনি চার জেলের। তাদের সন্ধান না পেয়ে চরম হতাশা ও অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা।
উপজেলা পরিষদ কর্তৃক প্রস্তুত একটি পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৩২ বছরে ১৮৮ জন জেলে সাগর বা নদী মোহনায় নিখোঁজ হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের সবার সলিলসমাধি হয়েছে।
গত ২৪ আগস্ট বঙ্গোপসাগরের গভীরে আকস্মিক ঝড় ও উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে এফবি বরকত নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার ১৩ জন জেলেসহ ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর আট জেলেকে প্রায় দুই ঘণ্টা পর ভাসমান কনটেইনারে (জাল ভাসিয়ে রাখার প্লাস্টিকের শূন্যপাত্র) থাকা অবস্থায় সাগর থেকে উদ্ধার করে ওই পথে যাতায়াতরত অপর একটি মাছ ধরার ট্রলার।
পরে তাদের পাথরঘাটা নিয়ে আসা হয়। তবে নিখোঁজ ছিলেন আরো পাঁচ জেলে।
ট্রলারডুবির প্রায় ২২ ঘণ্টা পর সাগর থেকে সাইকুল মীর (৩৩) নামে এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কিন্তু ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও নুর আলম (৩৭), কাউসার (৩০), ইব্রাহিম (২৮) ও বেলাল হোসেন (২২)—এই চার জেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বরগুনা জেলা ট্রলারমালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, নিখোঁজ জেলেদের বাড়ি পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে হতাশায়। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে জেলেদের।
নিহত সাইকুল মীরের স্ত্রী মাহমুদা বেগম বলেন, ‘ট্রলারডুবির দু-তিন দিন পর দু-একজন কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন।
তবে সেই সহযোগিতাও এখন শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে পরিবার নিয়ে খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। সন্তানদের স্কুল-মাদরাসায় পাঠানোও প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক পরিবারের বৃদ্ধ মা-বাবার ঠিকমতো চিকিৎসাও করানো সম্ভব হচ্ছে না।’
সাগরে নিখোঁজ নুর আলমের স্ত্রী হাফিজা (৩৩) জানান, তিনি এক মেয়ে ও এক ছেলের মা। মেয়ের বয়স ১৭ বছর, ছেলের বয়স ৫ বছর; কিন্তু মেয়ে বাকপ্রতিবন্ধী। একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীর মৃত্যুর পর চারদিকে এখন অন্ধকার দেখছেন।
ডুবে যাওয়া ট্রলারের মালিক ও মাঝি বাদল মোল্লা জানান, ট্রলারডুবির ২২ ঘণ্টা পর সাইকুল মীরের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হলেও এক মাস পেরিয়ে গেলেও নুর আলম, কাউসার, ইব্রাহিম ও বেলাল হোসেনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও ট্রলারে ছিলাম। ট্রলারডুবির পর জেলা ট্রলার মালিক সমিতি ও আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে দুটি ট্রলার এবং একদল বেসরকারি ডুবুরি নিয়ে সাগরে যাই। ডুবে যাওয়া ট্রলারটি উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ ও অতিরিক্ত ঢেউয়ের কারণে ট্রলারের সঙ্গে দড়ি বাঁধা সম্ভব হয়নি। দুই দফা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে উদ্ধার অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হই।’
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাপস পাল বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘মৎস্য সেক্টরের স্বার্থে সাগরে উদ্ধারকাজের জন্য হামজা বা রুস্তমের মতো তবে আধুনিক উদ্ধার যান আবশ্যক, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
পাথরঘাটা থানার ওসি আব্দুল আলীম বলেন, ‘জেলেরা নিজেদের উদ্যোগে সাইকুল মীরের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তবে বাকি চার জেলের মরদেহের কোনো সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ চার জেলের স্বজনরা দ্রুত তাদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।’
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।



















আপনার মতামত লিখুন :