রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশু রামিসাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে হত্যার ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যেই মূল আসামি সোহেল রানা নতুন করে ডলার নামের আরেক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার দাবি করেছেন বলে মনে করছে পুলিশ।
সোমবার (১ জুন) পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির জানান, যেদিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে সেদিন সোহেল রানাকে জানালার গ্রিল ভেঙে একাই পালিয়ে যেতে আশপাশের অনেক মানুষ দেখেছে।
তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে এবং তদন্তে তার স্ত্রীর ছাড়া অন্য কারো সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ওসি বলেন, কারাগারে বিভিন্ন ধরনের অপরাধী থাকে। সেখানে কেউ হয়তো তাকে পরামর্শ দিয়েছে যে অন্য কারো নাম জড়ালে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া কিছুটা হলেও বিলম্বিত হতে পারে। তবে ডলারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।
তবে এটা পরিষ্কার, সোহেল রানা মামলা বিলম্বিত করার জন্য কারো পরামর্শে এ কাজ করেছেন।
অন্য এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘কারাগারে হয়তো কোনো বন্দি সোহেল রানাকে বুদ্ধি দিয়েছে কারো নাম বললে বিচারপ্রক্রিয়া পিছিয়ে যাবে। দুষ্টুমির ছলে হোক আর যেভাবে হোক, এ রকম বুদ্ধি তাকে কেউ না কেউ দিয়েছে।’
আজ সোমবার শিশু রামিসাকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি।ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করেছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দিন।’ এ সময় তিনি দাবি করেন, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ‘ডলার’ নামে একজন তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল।
সোমবার এ মামলায় ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই সঙ্গে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য মঙ্গলবার (২ জুন) দিন ধার্য করেন আদালত।
এর আগে গত ২৫ মে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান। ওই দিনই মামলাটি পরবর্তী বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। এরপর চার্জশুনানির জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়।
মামলার অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে ওই অপরাধে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জানা যায়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার সময় ঘর থেকে বের হলে আসামি কৌশলে ভিক্টিমকে তার ফ্ল্যাটের রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টায় বাদী মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। একপর্যায়ে আসামি সোহেল রানার রুমের সামনে বাদী তার মেয়ের জুতা দেখতে পেয়ে ডাকাডাকি করলে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে বাদী তার স্ত্রী ও অন্য ফ্ল্যাটের লোকজনকে নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় আসামির শয়ন কক্ষের মেঝেতে ভিকটিম রামিসার মাথাবিহীন লাশ দেখতে পান। আর মাথা রুমের ভেতর রঙের বড় বালতির ভেতর দেখতে পান।এসময় আসামি স্বপ্নাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেয়ে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, তার স্বামী সোহেল রানা বাদীর শিশু কন্যাকে বাথরুমের আটকে রেখে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে। লাশ গুম করার উদ্দেশে স্বপ্নার সহায়তায় সোহেল ভিকটিমের মাথা, ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করে ও যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে এবং দুইহাত কাঁধ থেকে অর্ধবিচ্ছিন্ন করে লাশ বাথরুম থেকে আসামিদের শয়ন কক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে।
পরে ওই রুমের জানালার গ্রিল কেটে আসামি সোহেল রানা পালিয়ে যায়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে আসামি স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। আর নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় রামিসার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন। গত ২১ মে সেই মামলায় সোহেল রানা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
রামিসার বাবা তার পরিবারকে নিয়ে পল্লবী থানাধীন সেকশন-১১, ব্লক-বি এলাকায় ফ্ল্যাটে ভাড়া বাসায় থেকে বনানীতে একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন। আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারও একই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে থাকতেন। রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করত।