প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল।
পবিত্র ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ১০৪৬ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত, ২২৩ জন আহত হয়েছে। নৌপথে ০৮টি দুর্ঘটনায় ০৮ জন নিহত, ১৯ জন আহত ও ০৩ জন নিখোঁজ রয়েছে।
সড়ক, রেল ও নৌপথে সর্বমোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ১২৮৮ জন আহত হয়েছে।গণমাধ্যম বিশ্লেষণে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
একই সময়ে জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২১৭৮ জন ভর্তি হয়েছে। চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে গত ১৫ দিনে হতাহত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি।
আজ সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই তথ্য তুলে ধরেন।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল।
এই সময় সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ৭১ জন চালক, ৫৫ জন শিশু, ৫৪ জন পথচারী, ৫১ জন নারী, ৪২ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন পরিবহন শ্রমিক, ০৭ জন শিক্ষক, ০৪ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য, ০৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ০৩ জন প্রকৌশলী, ০২ জন সাংবাদিক, ০১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ০১ জন চিকিৎসকের পরিচয় মিলেছে।
সংগঠিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ২৭.১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭.৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, ১৬.২২ শতাংশ বাস, ১৫.২৮ শতাংশ ব্যাটারীচালিত রিক্সা, ৮.৪৯ শতাংশ কার-মাইক্রো, ৭.৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন ও ৭.৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। দুর্ঘটনার ৩৫.৮৩ শতাংশ কার-মাইক্রো, ৭.৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন ও ৭.৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। দুর্ঘটনার ৩৫.৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩২.৩৬ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা, ২২.২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, ০.৫৭ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনে, ০.৫৭ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে ও ৮.৩৮ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৪৩.০৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.০৫ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২১.৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এ ছাড়া সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪.০৪ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.২৮ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও ০.৫৭ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার শপথ গ্রহণের ০২ দিন পরে রমজান শুরু, এক মাসের মাথায় ঈদযাত্রা। নতুন সরকারের ব্যর্থতা খুঁজতে নয়; বরং সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার মানসে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ঈদযাত্রায় প্রাণহানির পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। সরকার নতুন হলেও পুরনো আমলা, পূর্বের মাফিয়া নেতাদের অনুসারী বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান সরকার সমর্থিত নেতাদের চাপে আওয়ামী লীগ সরকারের মতো এবারও সড়ক পরিবহনমন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএসহ পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সস্থার ঈদ ব্যবস্থাপনা সভায় লাখো যাত্রীর পক্ষে কথা বলার মতো যাত্রী ও নাগরিক সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। মালিকরা একচেটিয়া সুবিধা লুফে নিতে এমন অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন প্রভাবমুক্ত থাকায় ঈদযাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছিল, যা সর্বমহলে প্রশংসা পেয়েছে। এবারের ঈদে বাস মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাবের কারণে ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা, পরিবহনের বিশৃঙ্খলা অতীতের দুটি ঈদের তুলনায় বেড়েছে। সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল বাস মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রিত। ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পদ্ধতি অনুসরণের কারণে
সড়ক পরিবহন সেক্টরে সরকারের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
দুর্ঘটনার কারণসমূহ
দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা অবাধে চলাচল। জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকা, রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ বাস উঠে আসা। সড়কে মিডিয়ামে রোড ডিভাইডার না থাকা, অন্ধবাঁকে গাছপালায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি।
মহাসড়কের নির্মান ত্রুটি, যানবাহনের নানাবিধ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।
উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন। বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং একজন চালক অতিরিক্ত সময় ধরে
যানবাহন চালানো। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের কারণে বাসের ছাদে, খোলা ট্রাক ও পিকআপে, ট্রেনের ছাদে, বাসের ইঞ্জিন বনাটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসাধারণের যাতায়াত।
দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সুপারিশসমূহ
সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতি চালু করা। মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা আমদাদি ও নিবন্ধন বন্ধ করা। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতে অবাধে চলাচলের জন্য আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা। দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান। বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের সরকার ঘোষিত ৬০ ঘণ্টা ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা। পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা। গুরুত্বপূর্ণ
জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা। সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা।
মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা। উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালু করা। ঈদযাত্রা একসাথে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর দাবি জানানো হয়েছে।এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন যাত্রী কল্যাণ সমিতি অর্থ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, সদস্য আলমগীর কবির, মনজুর হোসেন ঈসা, ড্রাইভার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি বাদল আহমেদ, মনজুর হোসেন, আজাদ হোসেন টিপু প্রমুখ।