ভিটেমাটি আছে। তবে সেখানে বাসযোগ্য ঘর নেই জিয়া শেখ ও স্বপ্না দম্পতির।
তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। জরাজীর্ণ ঘরে ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে সন্তানদের নিয়ে কোনোরকম বসবাস করেন এই দম্পতি। আশা ছিল কোরবানির ঈদে তাদের পালিত ষাঁড়টি বিক্রি করবেন। সেই টাকায় টিনের ঘর তুলবেন।
কিন্তু এক রাতেই সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার।
রবিবার (২৪ মে) রাতের কোনো এক সময় গোয়ালঘরের দরজায় লাগানো শিকল কেটে তাদের পালিত গরুটি চুরি করে নিয়ে গেছে চোর। এখন দিশাহারা দিনমজুর জিয়া শেখ। স্ত্রী-সন্তানের কান্না থামাতে পারছেন না।
এ ঘটনায় নিজেও ভেঙে পড়েছেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছে নড়াইল লোহাগড়া উপজেলার লক্ষীপাশা ইউনিয়নের বাঁকা গ্রামে।এ ঘটনায় লোহাগড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) অভিযোগের বিষয়ে ঘটনাস্থলে তদন্তে আসেন লোহাগড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বিজন কুমার।ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোরকম সংসার চালান তিনি। গতবছর নিজ বাড়ি থেকে ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়। এরপর কিস্তিতে ঋণ করে আরেকটি ভ্যান কেনেন। সেটিও এক রাতে চুরি হয়ে যায়। পরপর দুইটি ভ্যান চুরি হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন জিয়া। এরপর সংসারের অভাব দূর করতে একটি গরু পালন করেন এ দম্পতি। কোরবানির ঈদে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দামও দিতে চান ক্রেতারা। কিন্তু বেশি দামের আশায় গরুটি রেখে দেন তারা। রবিবার রাতের কোনো এক সময় চোর শিকল কেটে গোয়ালঘর থেকে চুরি করে নিয়ে যায় গরুটি। তাদের স্বপ্ন ছিল গরুটি বিক্রি করে এ বছর টিনের একটি ঘর করবেন।
এদিকে, জিয়া শেখের বড় মেয়ে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। দুই ছেলে ছোট। মেয়েটির উচ্চ শিক্ষা নিয়েও তিনি এখন দুশ্চিন্তায়।
জিয়া শেখ বলেন, ‘তিনটা সন্তান আমার। দুইটা ছেলে, একটা মেয়ে। মেয়েটা একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আমার কোমরে ব্যথা। বিলে-মাঠে কাজ করতে পারি না। কোমরের সমস্যার জন্য ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই। এক বছরে আমার দুইটা ভ্যান চুরি হয়ে গেছে। ভাঙা একটি ঘরে বৃষ্টি এলেই পানি পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘ঝড় উঠলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে পাশের বাড়ি দৌড়ে উঠি। ভাবছিলাম গরু বেচে এবছর ঘর দিব। গরুটার দামও উঠছিল এক লাখ ২০ হাজার টাকা। ভাবছিলাম আরো দাম পাবো। ঘর আমার কপালে নাই।’
জিয়া শেখ আরো বলেন, ‘মেয়েটা বড় হচ্ছে। তারে বিয়ে দিতে হবে। লোকজন বাড়ি আসবে। আমার সব শেষ করে দিয়েছে চোরের দল। সকালে আমি গরু খুঁজতে বের হয়ে দেখি পুকুরপাড়ে আমার গরুর চামড়া পড়ে আছে।’ তিনি বলেন, ‘পোষা গরুটাকে চোরেরা জবাই করে মাংস বিক্রি করেছে। এ ঘটনায় লোহাগড়া থানায় অভিযোগ করেছি। আজ পুলিশ এসেছিল। আল্লাহ যেন এর সঠিক বিচার করেন।’
এদিকে, কথা বলার সময় চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল স্বপ্না বেগমের। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো খাবার দিয়ে গোয়ালঘরে রেখে দিয়েছিলাম গরুটাকে। মাঝরাতে একবার এসে দেখেও গেছি। তখন গোয়ালে বাঁধা ছিল গরুটা। ভোররাতে চোরেরা আমার গরুটাকে চুরি করেছে।’ তিনি বলেন, ‘কিস্তি তুলে গরুটা কিনেছিলাম। কিস্তির টাকা শোধ হতে না হতে গরুটা চুরি হয়ে গেল। আমার সব শেষ হয়ে গেল।’
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কোমরে ব্যথার কারণে কৃষিকাজ করতে পারেন না জিয়া শেখ।স্থানীয় লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘জিয়া ও স্বপ্না দম্পতির বসতবাড়িটি ছাড়া কোনো সম্পদ নেই। পোষা গরুটি ছিল তাদের একমাত্র সম্পদ। পরিবারের সম্বল গরুটি চুরি হয়ে যাওয়ায় পরিবারটি ভেঙে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘চুরির বিষয়ে তারা থানায় অভিযোগ করেছেন। চোর চক্রটিকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
লোহাগড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বিজন কুমার বলেন, গরু চুরির বিষয়ে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তদন্ত চলছে। দোষীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে
।