শিরোনামঃ

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুর কাচারি বাড়ি

admin5
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুর কাচারি বাড়ি
Getting your Trinity Audio player ready...

*রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুর কাচারি বাড়ি*

*রাউতারা জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত, কবির সাহিত্যচর্চার তীর্থস্থান*

 

*মোঃ ইনসাফ আলী | সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি | দেশের প্রত্যয়*

 

*সিরাজগঞ্জ:* পদ্মা এখন যমুনা। কিন্তু যমুনার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইট-সুরকির বাড়িটি আজও পদ্মার ঢেউয়ের গল্প বলে। সিরাজগঞ্জের *শাহজাদপুর উপজেলা সদরে* অবস্থিত এই বাড়ি দুই নামে পরিচিত—স্থানীয়দের কাছে *“রাউতারা জমিদার বাড়ি”*, সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে *“রবীন্দ্র কাচারি বাড়ি ও জাদুঘর”*। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৬ বছরের স্মৃতি মিশে আছে এই বাড়ির প্রতিটি ইটে।

 

*ইতিহাস – জমিদারি থেকে কবির আড্ডাখানা*

 

*জমিদারি পত্তন:* ১৭৮০ সালের দিকে যশোরের ভূষণা থেকে ঠাকুর পরিবার এখানে জমিদারি কিনে নেয়। রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর শাহজাদপুর, পতিসর, কালিগ্রাম মিলিয়ে বিশাল জমিদারি গড়ে তোলেন।

 

*রবীন্দ্রনাথের বসবাস:* ১৮৯০ সালে ২৯ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ পিতার নির্দেশে শাহজাদপুরের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে এখানে আসেন। ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত ৬ বছর তিনি এই বাড়িতে থেকেছেন। তখন এটাকে “কাচারি বাড়ি” বলা হতো—মানে খাজনা আদায় ও বিচার-আচারের অফিস।

 

*রাউতারা নাম কেন?* স্থানীয় জনশ্রুতি—বাড়ির আশপাশের এলাকা “রাউতাড়া” বা “রাউতারা” মৌজায় পড়ায় লোকে একে রাউতারা জমিদার বাড়ি বলে ডাকে।

 

*স্থাপত্য ও বর্তমান রূপ*

 

*গঠন:* ৩ তলা বিশিষ্ট পাকা ভবন। নিচ তলায় কাচারি ঘর, খাজনা ঘর, বৈঠকখানা। দোতলায় রবীন্দ্রনাথের বসবাস ও লেখার ঘর। ছাদে যাওয়ার গোল সিঁড়ি। সামনে বিশাল পুকুর—“ঠাকুর দিঘি” নামে পরিচিত।

 

*অবস্থান:* শাহজাদপুর পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড, শাহজাদপুর সরকারি কলেজের পাশে। যমুনা নদী থেকে মাত্র ১ কিমি দূরে।

 

*জাদুঘর:* ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার বাড়িটি সংরক্ষণ করে “রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আছে।

 

*জাদুঘরে যা দেখবেন – কবির ছোঁয়া*

 

দোতলার ৪ নং কক্ষটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের “লেখার ঘর”। এখানে বসেই তিনি লিখেছেন:

1. *কাব্য:* সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, ক্ষণিকা

2. *গল্প:* পোস্টমাস্টার, ছুটি, দেনা-পাওনা

3. *উপন্যাস:* চোখের বালি

 

*সংরক্ষিত জিনিস:*

1. কবির ব্যবহৃত কাঠের খাট, চেয়ার-টেবিল, আলমারি

2. অরিজিনাল হাতের লেখার পাণ্ডুলিপি, চিঠি

3. কবির তৈলচিত্র, ছবি, বই

4. জমিদারি খাতা, সিলমোহর, পালকি

5. কবির পরা জুতা, চশমা, কলম

 

পুকুর পাড়ে বাঁধানো ঘাট। কবি এখানে বসে নৌকার মাঝিদের গান শুনতেন। “আমার সোনার বাংলা” লেখার অনুপ্রেরণা এখানকার মাঠ-ঘাট থেকেই পেয়েছেন বলে গবেষকরা মনে করেন।

 

*দর্শনার্থীদের ভিড় ও সময়সূচি*

 

*খোলা:* শনি-বুধবার সকাল ১০টা – বিকেল ৫টা। বৃহস্পতি-শুক্রবার ও সরকারি ছুটি বন্ধ।

 

*টিকিট:* বাংলাদেশি ২০ টাকা, সার্কভুক্ত ১০ টাকা, বিদেশি ২০০ টাকা। শিক্ষার্থীদের হাফ টিকিট।

 

*ভিড়:* বৈশাখ-শ্রাবণ মাসে রবীন্দ্রভক্তদের ঢল নামে। ২৫ বৈশাখ ও ২ শ্রাবণে জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে ৩ দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সারা দেশ থেকে আবৃত্তি, গান, নৃত্যের দল আসে।

 

*স্থানীয়দের স্মৃতি*

 

৭৫ বছরের বৃদ্ধ হাজী আব্দুল জব্বার বলেন, “আমার দাদার মুখে শুনেছি, রবি ঠাকুর নৌকা করে পদ্মায় ঘুরতেন। গরিব প্রজাদের খাজনা মাফ করে দিতেন। এখানকার মানুষ তাকে ‘বাবু’ বলে ডাকত”।

 

জাদুঘরের কিউরেটর বলেন, “বাড়িটি এখনো আগের মতোই আছে। সংস্কার করলেও ব্রিটিশ আমলের ইট-কাঠ বদলানো হয়নি। প্রতিদিন ২০-৩০ জন দর্শনার্থী আসেন”।

 

*কিভাবে যাবেন

 

*ঢাকা থেকে:* গাবতলী থেকে পাবনা/শাহজাদপুরগামী বাসে শাহজাদপুর বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে রিকশা/অটোতে ৫ মিনিট, ভাড়া ২০ টাকা।

 

 

1. বিকেল ৪টার পর আলো কমে যায়, ছবি তুলতে সমস্যা।

2. জাদুঘরের ভেতরে মোবাইল ফোন নীরব রাখুন, ফ্ল্যাশ ছাড়া ছবি তুলুন।

3. কাচারি বাড়ি দেখে ১ কিমি দূরে যমুনা পাড় বাঘাবাড়ি ঘাট ঘুরে আসুন—কবির নৌকা ভ্রমণের ফিল পাবেন।

 

*শেষ কথা – ইটের মধ্যে কবিতা*

 

রাউতারা জমিদার বাড়ি মানে শুধু পুরনো দালান না। এটা বাংলা সাহিত্যের জন্মভূমি। রবীন্দ্রনাথ এখানে জমিদার ছিলেন, কিন্তু প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট দেখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন “বিশ্বকবি”।

 

শাহজাদপুরের এই কাচারি বাড়ি প্রমাণ করে—প্রকৃতি, মানুষ আর মাটির টান না থাকলে “সোনার তরী” লেখা যায় না। ইট-সুরকির ফাঁক দিয়ে আজও কবির কণ্ঠ শোনা যায়: “এই বাংলার মাটি, এই বাংলার জল…”

জরুরী বিজ্ঞপ্তি: বিঃদ্রঃএই ওয়েব সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।