তিস্তার ভাঙনে ক্রসবাঁধ ভেঙে ঝুঁকিতে পড়েছে বাড়ি। তাই আতঙ্ক নিয়ে বাঁধের ধারে বসে আছেন বৃদ্ধ জবের আলী। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ
জবের আলীর বসবাস তিস্তাপারে। ২০২০ সালে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বুড়িরহাট ক্রসবাঁধটির অংশ বিশেষ ভেঙে গেলে খিতাবখা গ্রামের জবের আলীর ভিটেও গিলে খায় তিস্তা।
তার পর থেকে বাঁধের ধারে মাথা গুঁজে রয়েছেন ৮৫ বছরের এই বৃদ্ধ।
সপ্তাহ দুয়েক আগে হঠাৎ ফুঁসে ওঠা তিস্তার তোপে বিলীন হয় ক্রসবাঁধের অংশবিশেষ। এরপর ফের আতঙ্ক ভর করে জবের আলীর চোখে-মুখে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখা এই প্রবীণ ব্যক্তিটি ভেবেছিলেন, এবার খনন আর পাড় বেঁধে তিস্তাকে বাগে আনা হবে; ভিটেমাটি সুরক্ষিত করে চাষবাস করে জীবনধারণ করতে পারবেন তারা।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসে ভরসা করতে পারছেন না পোড়খাওয়া এই বৃদ্ধ। বলেন, ‘এই তিস্তা হামার দুঃখ। যখন ব্যারাজের গেট ছাড়ি দেয়, নদী পাক দেয়, ডুকরি ওঠে। হামার বুক কাঁপে।
চপুর আইত নিন্দ হয় না (সারা রাত ঘুম ধরে না)। শুনি বোলে তিস্তা বাইন্ধবে। সগাই (সবাই) আশা দেয়, কাম হয় না।’
৩০ বছর আগে ভিটে হারিয়ে বাঁধের ধারে বসত গড়েছেন রাজারহাটের তিস্তাপারের রামহরি গ্রামের আব্দুল মজিদ। তাও তিস্তার চোখ রাঙানিতে বিপন্ন।
ফসলি জমি তিস্তার গর্ভে। মহাপরিকল্পনা তাদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু ভরসা পাচ্ছেন না।
একরাশ হতাশা নিয়ে আব্দুল মজিদ বলেন, ‘৩০ বছর ধরি শুনি নদী খুঁড়বে, পাড় বাইন্ধবে। সরকার আইসে, সরকার যায়—হামার আশা পূরণ হয় না।’
নির্বাচনের আগে তিস্তার পাড়ে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ নামে একটি বড় আন্দোলনে শামিল হয়েছিল তিস্তাপারের মানুষ। মশাল মিছিল, গানের সুরে জেগে উঠেছিল তিস্তাপার। সেই আন্দোলনের সফলতা নিয়ে সংশয় কাটেনি সেখানকার মানুষের। খিতাবখা গ্রামের গৃহবধূ মমতা বেগম তাই আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘ভোটের আগে তিস্তা বাঁচাই। ভোট বের হইলে তিস্তা মরে।’
রাজারহাটের গতিয়াশাম, রামহরি, খিঁতাবখা, গাবুরহেলান, ডাংরা, রতি, উলিপুরের ঠুটাপাইকর, হোকডাঙা, চিলমারীর চর বজরা-সব গ্রামেই ভাঙন আতঙ্ক। এসব গ্রামের অনেকগুলো শুধু নামেই টিকে আছে, বেশিরভাগই তিস্তার গর্ভে। বাকি অংশের মানুষও সব সময় থাকে ভাঙন আতঙ্কে, ঘর-বাড়ি হারানোর ভয়ে।
কয়েকদিন আগে বুড়িরহাটের ক্রসবাঁধের ৪০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। ফলে ভাটির দিকে ৮-১০টি গ্রামে ভাঙন আতঙ্ক দেখা যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙা অংশ মেরামতের কাজ করছে। নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ পলাশপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ ধানি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রবল স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর তীর ধরে। হাসারপাড় এলাকার উজান ও ভাটিতে ভাঙছে প্রতিনিয়ত।
তিস্তাপারের মানুষ বলছে, দীর্ঘদিন খননকাজ না করায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে আছে। ফলে মে মাস থেকে অধিকাংশ সময় তিস্তার পানি থাকছে বিপৎসীমার কাছাকাছি। এতে ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে কুড়িগ্রামের অংশের ২০ কিলোমিটার এলাকা। জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় ব্যস্ত থাকতে হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। কিন্তু কোথাও কোথাও জিও ব্যাগ, ক্রসবাঁধে ধস নামায় আতঙ্ক কাটেনি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে তিস্তার আরো ৫-৬টি পয়েন্ট ভাঙনপ্রবণ। অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে সেসব পয়েন্টে ভাঙনরোধের চেষ্টা করা হবে।
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
















আপনার মতামত লিখুন :