বছরে রক্তের প্রয়োজন ১০ লাখ ইউনিট, মাত্র ৩০ শতাংশ আসে স্বেচ্ছায়
দেশে রক্ত দেওয়ার উপযুক্ত মানুষ কোটি কোটি। রক্ত সঞ্চালন খাতের বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, প্রচলিত বয়সসীমা ও জনসংখ্যার কাঠামো বিবেচনায় প্রায় ১২ কোটি মানুষ রক্তদানের সক্ষম বয়সে রয়েছে।
তাদের সামান্য একটি অংশও যদি নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দেয়, তাহলে রক্তের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। রোগীর অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনা, প্রসবজনিত রক্তক্ষরণ কিংবা থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগে রক্তের প্রয়োজন হলেই স্বজনদের শুরু হয় দাতা খোঁজার দৌড়ঝাঁপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বাংলাদেশবিষয়ক তথ্যে বলা হয়েছে, দেশে বছরে আনুমানিক আট থেকে ১০ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন।
কিন্তু সংগৃহীত রক্তের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ আসে স্বেচ্ছায় ও বিনা পারিশ্রমিকে রক্তদানকারী মানুষের কাছ থেকে। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ আসে রোগীর পরিবার বা বিকল্প দাতাদের কাছ থেকে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সংকটটি কেবল রক্তের পরিমাণের সংকট নয়; বরং রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বণ্টন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতা তৈরির ব্যবস্থার সংকট। আর এই ব্যবস্থার দুর্বলতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় রোগী ও তার পরিবারকে।
কারণ, প্রয়োজনের সময় রক্ত মেলে না। তথ্য-উপাত্ত বলছে, দেশে এখনো স্বেচ্ছা রক্তদাতার সংকট অনেক বেশি।
অথচ নিয়মিত রক্তদান নিজের স্বাস্থ্যের জন্য যে কতটা উপকারী, যা জেনে বিস্মিত হতে হয়। আর এটা না জানাই মূলত আমাদের দেশে রক্ত সংকট প্রকট করে তুলেছে। এর পাশাপাশি অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে আরো কয়েকটি বিষয়।
স্বেচ্ছা রক্তদাতা ২৫-৩০% : ২০১৫ সালে দেশে প্রায় ছয় লাখ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ হয়েছিল, যেখানে বার্ষিক প্রয়োজন ছিল আট লাখের বেশি। তখনো মোট রক্তের মাত্র ৩০ শতাংশ এসেছিল স্বেচ্ছা দাতাদের কাছ থেকে। অর্থাৎ এক দশক ধরে স্বেচ্ছা রক্তদানের অংশ প্রায় ৩০ শতাংশের আশপাশেই ঘুরছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জাতীয় নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে মোট ৯ লাখ ৬০ হাজার ৯৮১ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে সরকারি খাত সংগ্রহ করে সাত লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৯ ইউনিট এবং বেসরকারি খাত দুই লাখ পাঁচ হাজার ৬২৪ ইউনিট। মোট সংগৃহীত রক্তের ৭৫.৭৪ শতাংশ ছিল আত্মীয় বা বিকল্প দাতার কাছ থেকে, আর স্বেচ্ছা দাতার অংশ ছিল ২৪.২৬ শতাংশ।
অর্থাৎ দেশে রক্ত সংগ্রহের পরিমাণ বাড়লেও স্বেচ্ছা রক্তদাতার ওপর নিভর্রতা এখনো যথেষ্ট নয়। এমনকি দেশে স্বেচ্ছা রক্তদাতা সংগ্রহের জন্য কোনো একক জাতীয় প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, সন্ধানী, বাঁধন, কোয়ান্টামসহ বিভিন্ন সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পুরো ব্যবস্থা এখনো বিকেন্দ্রীভূত।
রিদম ব্লাড ব্যাংকের তথ্য মতে, দেশে রক্তদানের উপযুক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ নিয়মিত ও স্বেচ্ছায় রক্ত দিলে দেশের প্রয়োজনীয় রক্তের বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব।
রিদমের পরিচালক ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘দেশে রক্তদাতা নেই—সমস্যাটা আসলে এমন নয়। আমাদের বিপুলসংখ্যক সক্ষম মানুষ রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশ নিয়মিত রক্তদানের সঙ্গে যুক্ত নয়। মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দিলে রক্তের সংকট অনেকটাই দূর করা সম্ভব।’
রক্তদান বিস্ময়কর উপকারী : আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিয়মিত রক্তদানের একাধিক স্বাস্থ্যগত উপকারিতার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিখ্যাত সাময়িকী আমেরিকান জার্নাল অব এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত ফিনল্যান্ডের কুওপিও ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ রিস্ক ফ্যাক্টর স্টাডির দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত রক্তদানকারী পুরুষদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় ৮৮ শতাংশ হ্রাস পায়।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সায়েন্স জার্নাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব ব্লাড অ্যান্ড বায়োথেরাপিসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রক্তদান করলে রক্ত উৎপাদনকারী স্টেম সেলের জেনেটিক্যাল স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং এটি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর মিউটেশন প্রতিরোধে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে, মেডিক্যাল জার্নাল পাবমেডে প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তদানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রক্তে প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান হ্রাস পায় এবং শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এনজাইম বৃদ্ধি পায়।
রক্তদানের এই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রান্সফিউশন মেডিসিন ও ইমিউনোহেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মানবদেহের লোহিত রক্তকণিকার স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল হলো ১২০ দিন। রক্ত দেওয়ার পর শরীরের বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা নতুন ও সতেজ রক্তকণিকা তৈরির জন্য বিশেষভাবে উদ্দীপিত হয়, যা শরীরে এক ধরনের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া শুরু করে। রক্ত দেওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শরীরের তরল অংশ বা প্লাজমার ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন রক্তকোষ তৈরি হয়। তা ছাড়া শরীরে অতিরিক্ত আয়রন (ফেরিটিন) জমা হলে তা রক্তনালির ক্ষতি করে। রক্তদানের মাধ্যমে এই বাড়তি আয়রন বের হয়ে যাওয়ায় রক্তের সান্দ্রতা বা ঘনত্ব কমে যায়, যা হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং রক্তনালিতে ব্লকেজ বা রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।’
দাতার সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিক উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘রক্তদান কেবল গ্রহীতার জীবন বাঁচায় না, এটি দাতার জন্য একটি চমৎকার অদৃশ্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মিনি-হেলথ স্ক্রিনিং। রক্ত সংগ্রহের আগে প্রতিটি দাতার রক্তচাপ, পালস রেট ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়। এর পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি, সি, এইচআইভি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, যার মাধ্যমে শরীরে কোনো নীরব ঘাতক ব্যাধি থাকলে তা প্রাথমিক অবস্থাতেই ধরা পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই সুফলের বাইরেও অন্য একজন মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচানোর যে গভীর আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়, তা দাতার শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটায়।’
এক ব্যাগ রক্তে একাধিক প্রাণরক্ষা : রক্তের চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব করতে শুধু কত ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ হয়েছে, তা দেখলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ একটি পূর্ণ রক্তের ব্যাগ সরাসরি একজন রোগীকে দেওয়ার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন উপাদানে ভাগ করা সম্ভব। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী এসব উপাদান আলাদাভাবে ব্যবহার করা যায়। ফলে একটি রক্তদান থেকে একাধিক রোগী উপকৃত হওয়ার সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশেও এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৫০টি কেন্দ্র রক্তের বিভিন্ন উপাদান তৈরির সঙ্গে যুক্ত। এসব কেন্দ্রে লোহিত রক্তকণিকা, প্লাটিলেটসমৃদ্ধ প্লাজমা, প্লাটিলেট, তাজা প্লাজমা, হিমায়িত প্লাজমা ও ক্রায়োপ্রেসিপিটেটসহ বিভিন্ন রক্ত উপাদান তৈরি করা হয়। এর মধ্যে সরকারি খাতের ১৪টি কেন্দ্রে রক্ত থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্লাটিলেট সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্ঘটনা বা অস্ত্রোপচারে লোহিত রক্তকণিকার প্রয়োজন হতে পারে; আবার ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন অবস্থায় প্লাটিলেটের প্রয়োজন হয়। প্রসবজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, লিভারের জটিলতা কিংবা রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যায় প্লাজমার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক তথ্যে দেখা যায়, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সংগৃহীত রক্তের তুলনামূলক কম অংশ বিভিন্ন উপাদানে পৃথক করা হয়; বিপরীতে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার অনেক বেশি। অর্থাৎ শুধু বেশি রক্ত সংগ্রহ করাই নয়, সংগৃহীত রক্তের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও রক্তব্যবস্থার দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সংস্থাটির মূল্যায়নে বাংলাদেশের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, জনবলের সংকট, স্বেচ্ছা রক্তদাতার স্বল্পতা এবং রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্রগুলোর নিয়মিত তদারকি ও নজরদারির ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতীয় রক্তকেন্দ্র ও আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপন, রক্তের নিরাপত্তা নজরদারি সম্প্রসারণ এবং প্লাজমা প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা তৈরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আছে সুযোগেরও অভাব : রক্ত না দেওয়ার জন্য সাধারণত মানুষের অসচেতনতা বা অনীহাকে দায়ী করা হয়। কিন্তু গবেষণার তথ্য বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। বাংলাদেশের জামালপুরের ৫১২ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৯২ শতাংশ কখনো রক্ত দেয়নি। অথচ ৪২ শতাংশের বেশি জানিয়েছে, তারা নিয়মিত রক্তদাতা হতে চায়। রক্ত না দেওয়ার কারণ হিসেবে ওই গবেষণায় ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জ্ঞানের ঘাটতি, ২০ শতাংশ সুযোগের অভাব, ২১ শতাংশ রক্ত দিলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে—এমন ধারণা এবং ১৬ শতাংশ সুইভীতির কথা জানিয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয়, ৬১ শতাংশ কোনো রক্তদান কর্মসূচির কথা শুনেছে বলে মনে করতে পারেনি।
২০২২ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩৯ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের রক্তদানের সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় প্রায় ২.৪ গুণ বেশি। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রক্তদানসংক্রান্ত প্রচার বা কর্মসূচি দেখেছেন এমন শিক্ষার্থীদের রক্তদানের সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৪.৭ গুণ বেশি।
২০২৪ সালে খুলনা শহরের ৬৯৭ জনের ওপর করা আরেক গবেষণাতেও দেখা যায়, রক্তদানের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদানের চর্চা ও জ্ঞানে ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে আরো ধারাবাহিকভাবে সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
রক্ত সঞ্চালন বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষকে শুধু রক্তদানে আহবান জানালেই হবে না; নিয়মিত দাতা তৈরির জন্য সহজ, নিরাপদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সেবা ব্যবস্থাপনা বিভাগের লাইন পরিচালক ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো বলেন, ‘দেশে রক্তের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এই চাহিদা পূরণে নিয়মিত ও স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে, যাতে রক্তের অভাবে কোনো জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে।’
এক দশকেও কাটেনি দুর্বলতা : বাংলাদেশের রক্তদাতাদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৪ শতাংশ দাতা রক্তদানকেন্দ্রের কর্মীদের দুর্বল বা অসহযোগিতামূলক আচরণকে রক্তদানের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রায় ৫৫ শতাংশ দাতা রক্তদানের আগে ব্যক্তিগত তথ্য ও পরীক্ষার ফলের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। আবার অর্ধেকের বেশি দাতার মধ্যে আশঙ্কা ছিল—তাঁদের স্বেচ্ছায় দেওয়া রক্ত হয়তো বিক্রি হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বাংলাদেশভিত্তিক মূল্যায়নেও স্বেচ্ছা রক্তদাতার ঘাটতি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো ও জনবলের সীমাবদ্ধতা, রক্ত সঞ্চালনকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার অসমতা এবং নিয়মিত তদারকি ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। একই মূল্যায়নে জাতীয় রক্তব্যবস্থাকে আরো সমন্বিত করা, রক্তের নিরাপত্তা নজরদারি জোরদার করা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
রক্ত সঞ্চালন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বেচ্ছা রক্তদাতা বাড়ানোর জন্য শুধু জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক প্রচার বা বিচ্ছিন্ন রক্তদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সারা বছর দাতা সংগ্রহ, দাতার তথ্য সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় রক্তদানের আহবান, দাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রক্তকেন্দ্রগুলোর সেবার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
গভীর সংকটে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা : রক্তের ব্যবস্থাপনা সংকট সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে। কারণ, এসব রোগীর জন্য রক্ত কোনো আকস্মিক চিকিৎসা-উপকরণ নয়; নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনই তাদের জীবন ধারণের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের হাসপাতালে প্রায় সাত হাজার ৮০০ থ্যালাসেমিয়া রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব রোগীর অনেকের প্রতি মাসে এক থেকে দুই ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অভিভাবকদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায়ও সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। এতে প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার নিয়মিত রক্তদাতা সংগ্রহে সমস্যার কথা জানিয়েছে। একই গবেষণায় প্রায় ৮১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা কোনো সংগঠিত রক্তদাতা সংগঠনের সহায়তা পায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার বা প্রসবজনিত রক্তক্ষরণের রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন অনেক সময় আকস্মিক। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং অনেকটাই পূর্বানুমানযোগ্য। ফলে এসব রোগীর জন্য নির্দিষ্ট স্বেচ্ছা রক্তদাতার তালিকা, নিয়মিত দাতা ব্যবস্থাপনা এবং রক্তকেন্দ্রের সঙ্গে রোগীর সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়। তাই তাঁদের জন্য নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতা তৈরি করা গেলে রোগী ও তাঁদের পরিবারের ওপর রক্ত সংগ্রহের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।’
আছে নিরাপদ রক্তের প্রশ্ন : রক্তের সংকট মানে শুধু পর্যাপ্ত রক্ত না থাকা নয়; রক্তটি নিরাপদ কি না—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি ও সি, সিফিলিসসহ বিভিন্ন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন সব সংগৃহীত রক্ত ব্যবহারের আগে এসব সংক্রমণের জন্য মানসম্মত পরীক্ষা, সংক্রমণের পরীক্ষায় পজিটিভ আসা দাতার ক্ষেত্রে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা এবং রক্তের গ্রুপ ও সামঞ্জস্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি রক্তকেন্দ্রে গুণগত মান ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত জনবল, নথিপত্র সংরক্ষণ ও নিয়মিত গুণগত মূল্যায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত সংগৃহীত ২৬৯ ব্যাগ রক্তই এই পাঁচ সংক্রমণের জন্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। একই সময় কক্সবাজারের সাতটি উপজেলায় দুই হাজার ৩৭১টি রক্ত সঞ্চালনের মধ্যে ৫৮০টি থ্যালাসেমিয়া রোগী, ৫৩৮টি রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত এবং ৩৮৯টি প্রসূতিসংক্রান্ত চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রক্ত পরীক্ষা হচ্ছে কি না—এটি দিয়ে নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। পরীক্ষার মান, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, ব্যবহৃত কিটের গুণগত মান, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ফলাফল সংরক্ষণ এবং সন্দেহজনক ফলাফলের পর করণীয়—পুরো ব্যবস্থাটিই মানসম্মত হতে হবে। এই প্রসঙ্গে ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত হলো—প্রতিটি রক্তকেন্দ্রে একই মানদণ্ডে রক্ত পরীক্ষা ও সংরক্ষণ করা। কোথাও ভালো পরীক্ষা হলো, আবার কোথাও দুর্বলমানের পরীক্ষা হলো—এমন বৈষম্য থাকলে জাতীয় রক্তব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের রোগী নিরাপত্তা ও রক্তের নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তা ডা. মুরাদ সুলতান বলেন, রক্তের নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ‘রক্ত পরীক্ষা হচ্ছে কি না’ নয়; বরং সব রক্তকেন্দ্রে একই মানের পরীক্ষা হচ্ছে কি না, পরীক্ষার ফলের গুণগত মান কিভাবে যাচাই হচ্ছে, রক্ত সংরক্ষণ ও পরিবহনে নির্ধারিত মান বজায় থাকছে কি না এবং রক্ত সঞ্চালনের পর কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে তা শনাক্ত ও নজরদারির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
করণীয় কী? : রক্তের সংকট কাটাতে প্রথমেই জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক রক্ত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ডা. মামুন বলেন, দেশের সব রক্তকেন্দ্র, হাসপাতাল ও স্বেচ্ছা রক্তদাতা সংগঠনকে একটি অভিন্ন তথ্যব্যবস্থার আওতায় এনে কোন এলাকায় কখন কোন রক্তের গ্রুপ ও উপাদানের চাহিদা রয়েছে, কত রক্ত মজুদ আছে এবং কতজন সক্রিয় দাতা রয়েছেন—তার নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রক্ত সংগ্রহ, পরীক্ষা, সংরক্ষণ ও উপাদান পৃথকীকরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান মনে করেন, স্বেচ্ছা রক্তদাতাকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে নিয়মিত দাতা তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সারা বছর রক্তদান কর্মসূচি চালাতে হবে। প্রতিটি দাতার তথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করে নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় রক্তদানের আহবান জানানো, দাতার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং রক্ত কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সে বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। পেশাদার দাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. জয়নাল আবেদীন (টিটো) বলেন, প্রতিটি রক্তকেন্দ্রে একই মানদণ্ডে রক্তবাহিত সংক্রমণের পরীক্ষা, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। রক্ত সংগ্রহ থেকে রোগীর শরীরে প্রয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।



















আপনার মতামত লিখুন :