নীল নৃত্যের দলনেতা কৃষ্ণ কর্মকারের কথায় দানের সেই চাপ স্পষ্ট।
বরগুনা পৌর শহরের বটতলা, লাকুরতলা, কালিবাড়ি আর ফুলতলার গলিগুলো সোমবার সকাল থেকেই যেন এক অন্য সময়ের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
চৈত্রসংক্রান্তির নীলনৃত্য শুরু হতেই ঢাক-ঢোলের শব্দে শহরের দৈনন্দিন কোলাহল কিছুটা পিছিয়ে যায়। কিন্তু সেই শব্দের নিচে, রঙের আড়ালে এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে এক অস্বস্তিকর সত্য। সেটি হচ্ছে, এই উৎসব আর আগের মতো নেই; এটি এখন টিকে থাকার হিসাব-নিকাশ।সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল ৯টা। সূর্য পুরোপুরি তাপ দেওয়ার আগেই শুরু হয় নৃত্য। অন্তত ১৪ জন পুরুষ অংশ নেন এই লোক-আচারভিত্তিক পরিবেশনায়। কখনো শিব, কখনো রাধা-কৃষ্ণের সাজে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে নাচেন।
নীল নৃত্যের দলনেতা কৃষ্ণ কর্মকারের কথায় দানের সেই চাপ স্পষ্ট।
কিন্তু আয় কি সেই খরচ তুলতে পারছে—এমন প্রশ্নের জবাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না তিনি। তবে বলছেন, কোথাও দান বেশি, কোথাও কম; কোথাও আবার আগ্রহই কমে গেছে। মূলত ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এই আয়োজন।
বাদ্যযন্ত্রের দায়িত্বে থাকা বিধান চন্দ্র রায় সেই পরিবর্তন আরো খোলাখুলি বলেন। তার কথায়, ‘আগে তিন দিন ধরে চলত নীল নৃত্য। এখন এক দিনেই খরচ তোলা কঠিন হয়ে গেছে। তবু ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য চালিয়ে যাচ্ছি।’
এই ‘চালিয়ে যাওয়া’ শব্দবন্ধই যেন পুরো গল্পের কেন্দ্র। কারণ এখানে আর শুধু সংস্কৃতি নেই, রয়েছে বাধ্যবাধকতা। এক সময় চৈত্রসংক্রান্তি মানে ছিল কয়েক দিনের উৎসব, পাড়াজুড়ে মিলন।
এখন তা সীমিত, সময় ছোট, অংশগ্রহণ কম। তরুণদের বড় অংশ এই আচার থেকে অনেক দূরে। তরুণদের কেউ কাজের চাপে, কেউ শহরমুখী জীবনে; কেউ আবার নতুন বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
দুপুরে গরমের তীব্রতায় নৃত্যে সাময়িক বিরতি পড়ে।
দুপুরে গরমের তীব্রতায় নৃত্যে সাময়িক বিরতি পড়ে। ঘাম, ধুলো আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে শিল্পীরা কিছুক্ষণ থেমে থাকেন, বিকেল পর্যন্ত চলার কথা আবার। এই বিরতির ফাঁকে মাঠপর্যায়ের ছবিটা আরো পরিষ্কার হয়।
নীল নৃত্যের আয়োজন চলছে, কিন্তু আগের জৌলুস নেই। স্থায়ী পৃষ্ঠপোষকতা নেই; পৌর বা সরকারি সহায়তাও নিয়মিত নয়। খরচের বোঝা তাই মূলত শিল্পী ও স্থানীয় আয়োজকদের কাঁধেই, আর সেই বোঝা প্রতিবছর একটু একটু করে ভারী হচ্ছে।
গলির মোড়ে ঢাকের শেষ টান যতক্ষণ বাজে, ততক্ষণ মনে হয় সব আগের মতোই আছে। কিন্তু শব্দ থামলে যে নীরবতা নামে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রেখে যায়। বরগুনার এই নীল নৃত্য তাই শুধু একটি লোক-উৎসব নয়, বরং একটি বদলে যাওয়া সমাজের
প্রতিচ্ছবি, যেখানে ঐতিহ্য এখনও নাচছে। কিন্তু অর্থনীর্তির সংকটের কারণে তার পায়ের নিচের জমি ক্রমশ নরম হয়ে আসছে।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, বিষয়টি উপপরিচালক অনিমেষ বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বরগুনার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ‘নীল নৃত্য এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী লোক-আচার। এটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। আয়োজকরা সহযোগিতা চাইলে সরকার এগিয়ে আসবে।’