শিরোনামঃ সিরাজগঞ্জের ঘামে গড়া বাংলাদেশঃ
মে দিবসে শ্রমিকদের প্রাপ্তি কতটুকু?
“আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা বিনোদন”-১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকের এই ন্যায্য দাবিতে পুলিশের গুলিতে ঝরে গিয়েছিল ১১টি তাজা প্রাণ। সেই রক্তের দাগ থেকেই জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। আজ ১৩৯ বছর পর সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লী, ধানকল আর নির্মাণ সাইটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে-শিকাগোর সেই চেতনা কি আমরা ধারণ করতে পেরেছি? সিরাজগঞ্জ: শ্রমিকের জেলা
যমুনার পশ্চিম পাড়ের এই জেলা শ্রমঘন অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র। বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুরের তাঁত শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ। জেলা চালকল মালিক সমিতির তথ্যমতে, সিরাজগঞ্জের ৩ শতাধিক অটো রাইস মিলে কাজ করেন ৪০ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ শ্রমিক। এছাড়া নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান-এই জেলার প্রতিটি ইট, প্রতিটি সংযোগে মিশে আছে শ্রমিকের ঘাম। বাস্তবতা: আইন আছে, প্রয়োেগ নেই
বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এ দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা, সপ্তাহে একদিন ছুটি, ন্যূনতম মজুরি, মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান থাকলেও সিরাজগঞ্জের মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।
বেলকুচির তাঁতি রহিম মিয়া জানান, “ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাঁত চালাই। মালিক হাজিরা দেয় ৪০০ টাকা। এই টাকায় চাল-ডাল কিনতেই শেষ।” শাহজাদপুরের ধানকল শ্রমিক জাহানারা বেগম বলেন, “ধুলার মধ্যে কাজ করে যক্ষ্মা বাঁধাইছি। মালিক চিকিৎসার টাকা দেয় না। মে দিবসে ছুটি পাই, কিন্তু পেটে ভাত না থাকলে ছুটি দিয়া কী করমু?”
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর তথ্যমতে, গত বছর শুধু সিরাজগঞ্জেই কালবৈশাখী ঝড়ে লাইন মেরামত করতে গিয়ে ২ জন লাইনম্যান প্রাণ হারিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব ও অতিরিক্ত কাজের চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।আশার আলো
তবে পরিবর্তনও আসছে। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর গত বছর ২৭টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে শিশুশ্রম বন্ধ ও বকেয়া মজুরি আদায় করেছে। তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে তাঁতিদের জন্য ৫% সুদে ঋণ কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন থেকে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিক পরিবারকে ২ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
শেষ কথা
মে দিবস কেবল লাল পতাকা হাতে মিছিলের দিন নয়। এদিন শপথের-সিরাজগঞ্জের কোনো তাঁতি যেন অভুক্ত না থাকে, কোনো নির্মাণ শ্রমিক যেন হেলমেট ছাড়া ছাদে না ওঠে, কোনো লাইনম্যান যেন ঝড়ের রাতে খুঁটি থেকে লাশ হয়ে না নামে। মালিক-শ্রমিক-সরকার ত্রিপক্ষীয় সমঝোতায় যখন শ্রমিকের ঘামে ভেজা টাকায় হাসি ফুটবে, তখনই সার্থক হবে শিকাগোর শহিদদের আত্মত্যাগ।
আজকের এই মে দিবসে সিরাজগঞ্জের লাখো শ্রমিককে জানাই লাল সালাম।