দেশে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে বাজেটে বিভিন্ন খাতে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মোবাইল ফোনসেট (স্মার্ট ও ফিচার ফোন) উৎপাদন উৎসাহিত করতে দেশের বিভিন্ন কম্পানিকে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছে।
এমন একটি প্রতিষ্ঠান অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি। কম্পানিটিকে ৫০ শতাংশ ব্যাটারি ও চার্জার উৎপাদন করার শর্তে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দিলেও তারা সেই শর্ত মানেনি।
উল্টো এসব পণ্য আমদানি অব্যাহত রেখেছে। এনবিআর ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশনের বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গ করে ভ্যাট সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। আর প্রমাণ পেয়েও এনবিআর প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে কালবেলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানকে বারবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। পরে তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি উল্লেখ করে তার
মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
সূত্র আরো জানায়, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের পর মোবাইল ফোনসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট ৫ শতাংশ নির্ধারিত ছিল। পর্যায়ক্রমে এই ভ্যাটের হার বেড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে। যদিও দুটি স্তরে সাড়ে ৭ এবং ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট বিদ্যমান রয়েছে। গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড এনবিআরের ভ্যাট অব্যাহতির ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনের (টেবিল-২) ছক অনুযায়ী, কমপ্লায়েন্স সাপেক্ষে সুবিধা পেয়ে আসছে।
টেবিল-২ অনুযায়ী, ভ্যাটের হার হবে সাড়ে ৭ শতাংশ। ভ্যাট অব্যাহতির কারণে এই সাড়ে ৭ শতাংশ দিতে হবে না প্রতিষ্ঠানটিকে। এ ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতির শর্ত হলো উৎপাদিত ফোনের চার্জার ও ব্যাটারির ৫০ শতাংশ নিজেরা উৎপাদন করতে হবে। আর বাকি ৫০
শতাংশ ব্যাটারি ও চার্জার আমদানি করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন ব্যাটারি ও চার্জার উৎপাদনের এই শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন ভ্যাট অব্যাহতির প্রথম দিকের প্রজ্ঞাপনের শর্ত আংশিক পালন করেছে। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ২০২৩ সালের পর ভ্যাট অব্যাহতির প্রজ্ঞাপনে নতুন করে চার্জার ও ব্যাটারি ৫০ শতাংশ উৎপাদনের শর্ত বেঁধে দিলে প্রতিষ্ঠানটি তা আর পালন করেনি।
এনবিআরের ভ্যাট অব্যাহতির ক্ষেত্রে নানা ধরনের অস্পষ্টতা ছিল জানিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, যারা ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়েছেন এবং যারা এসব সুবিধা-
সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন, তাদের বিষয়টি আরো ভালোভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল। পর্যালোচনা না করে এমন প্রজ্ঞান জারি করা এনবিআরের জন্য বিষয়টি এখন বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা বলছেন, ইভ্যাট রিটার্নেও কিছু জটিলতা রয়েছে। এখন তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি নিয়ে এনবিআর কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটকে এসব প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স সঠিক ছিল কি না, তা জানতে চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে কালবেলার পক্ষ থেকে গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জহুরুল হক বিপ্লবকে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। পরে এই প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে
একটি লিখিত বার্তা পাঠিয়ে তিনি দাবি করেন, তারা তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এনবিআরের ভ্যাট নীতি বিভাগে একটি আবেদন করেছেন। আবেদনে তারা জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির সদস্যরা ব্যাটারি ও চার্জার উৎপাদনের হিসাব বছরওয়ারি না করে মাসওয়ারি করে হিসাব দাখিল করেছেন। এ কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশনের এমডি আরো বলেন, তদন্ত কমিটি প্রজ্ঞাপনের শর্ত পরিপালন হয়নি বলে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে তদন্ত কমিটি, তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, প্রতি বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভ্যাট অব্যাহতির অনুমোদন বাড়ানো হয়। এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনের শর্ত বিবেচনায় না নিয়ে অনুমাননির্ভর কিছু বিষয় অবতারণা করে টেবিল-২-এ ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছে বলেও দাবি করেন গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশনের এমডি জহুরুল হক বিপ্লব।