অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী কোনো বিচ্যুতি ছিল না। বরং এই সংশোধনীর মাধ্যমে প্রণীত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি অপরিহার্য রক্ষাকবচ।
১৫ বছর আগে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায় বাতিল করে গত বছর ২০ নভেম্বর যে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ, সেই রায়ের পর্যবেক্ষণে এ কথা বলা হয়েছে। পূর্ববর্তী রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক আপিল মঞ্জুর ও পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন নিষ্পত্তি করে করে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সর্বসম্মত হয়ে এই রায় দিয়েছিলেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১০ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশ দেওয়ার ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়। তখন খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রায় পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে।
জুলাই অভ্যুত্থানে গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৪ বছর আগের বিতর্কিত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে গত বছর ২৭ আগস্ট আবেদন করেন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ ব্যক্তি।
পরে ১৭ অক্টোবর আবেদন করেন বিএনপির মহাসিচব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর পাঁচ দিন পর ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ ছাড়া আরেকটি আবেদন করেন নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন। এরপর আরো দুটি আবেদন করা হয়।
এসব আবেদনের দুটি আবেদনে আপিলের অনুমতি দিয়ে চারটি আবেদন এর সঙ্গে যুক্ত করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। একটি আবেদন কার্যতালিকা থেকে বাদ (আইট অব লিস্ট) দেওয়া দেওয়া হয়। পরে গত বছর ২১ অক্টোবর থেকে শুনানি শুরু হয়। বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ ব্যক্তির আপিলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আপিলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, রুহুল কুদ্দুস কাজল, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। আর রভিউ আবেদনের পক্ষে এবং ইটন্টারভেনার (মামলায় যুক্ত ব্যক্তি) হিসেবে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বদরুদ্দোজা বাদল, এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী ও এস এম শাহরিয়ার করিব। গত ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ দিন শুনানির পর ২০ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
পূর্ববর্তী রায়টি ছিল ত্রুটিপূর্ণ
২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে তৎকালীন আপিল বিভাগের রায় সম্পর্কে এই রায়ে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী রায়টি ছিল অনুমান নির্ভর এবং ত্রুটিপূর্ণ।
তৎকালীন আপিল বিভাগ বলেছিলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনির্বাচিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আঘাত করে। শুধু তাই না, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। একজন প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টার হওয়ার জন্য প্রভাবিত হতে পারেন এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো আইন বাতিল করা মানে হচ্ছে তা অনুমাননির্ভর রায়। এ ধরনের অনুমাননির্ভর রায় বিচার বিভাগের আইন প্রণয়নমূলক জ্ঞান এবং সংশোধনমূলক ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করে। শুধু তাই না, ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘অগণতান্ত্রিক’ এবং ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনের পরিপন্থী’ হিসেবে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
তত্ত্বাবধায়ক ছিল জাতীয় ঐকমত্যের ফসল
রায়ে বলা হয়েছে, জনগণের সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনের মাধ্যমেই নিশ্চিত হয় না, বরং জনগণের প্রকৃত সম্মতির প্রতিফলন ঘটে এমন একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই তা কার্যকর হয়।
আদালত রায়ে বলেছেন, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অনাস্থা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার একটি জাতীয় ঐকমত্যের ফসল। ত্রয়োদশ সংশোধনী কেবল একটি সাধারণ আইন ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল জনগণের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং একটি রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের জন্য জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা উদ্ভবের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে রায়ে বলা হয়েছে, একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি শুধু শুধু তৈরি হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।
প্রকৃতপক্ষে, এই ব্যবস্থাটির উদ্ভব হয়েছে একটি একটি অনন্য রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে। এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত আস্থার সংকট কাটানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিরপেক্ষ করে সবার জন্য সমান ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা করেছে। ফলে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আদালত রায়ে অভিমত দিয়েছেন যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এই অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হয়েছিল, তাই এটি নিজেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছে।
পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল বিচার বিভাগের ওপর আইন বিভাগের হস্তক্ষেপ
২০১১ সালের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৯ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনকে সর্বোচ্চ আদালত ‘গণতন্ত্রের করুণ পরিণতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন রায়ে। আদালত বলেছেন, তাত্ত্বিক গণতন্ত্রের চেয়ে কার্যকর ও বাস্তবমুখী গণতন্ত্রের জন্য নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অপরিহার্য।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১১ সালের ১০ মে রায় ঘোষণা করেন তৎকালনি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। তখন ঘোষিত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অর্থাৎ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন অগণতান্ত্রিক এবং তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে তা বাতিলযোগ্য। তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এই রায় ঘোষণার সাতদিন পর অর্থাৎ ১৭ মে অবসরে যান এ বি এম খায়রুল হক। অবসরে যাওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।
এই সংক্ষিপ্ত আদেশ এবং পূর্ণাঙ্গ রায় বের হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে সংসদে সংবিধানের ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’ পাসের প্রক্রিয়া নিয়েও পর্যালোচনা উঠে এসেছে এ রায়ে।
আদালত বলেছেন, ২০১১ সালের সংক্ষিপ্ত আদেশে পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার কথা থাকলেও তৎকালীন সংসদ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।
আদালতের মতে, এটি ছিল বিচার বিভাগের ওপর আইন বিভাগের এক ধরনের হস্তক্ষেপ এবং আদালতের নির্দেশনার লঙ্ঘন।
প্রকাশিত রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম আলাদা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘জনগণই সংসদ ও আদালতের প্রকৃত মালিক। সংবিধান ধ্বংসের জন্য নয়, বরং যারা সংবিধানকে কলুষিত করে তাদের উৎখাতের জন্যই জনগণ সর্বোচ্চ ক্ষমতা রাখে।
আপিল বিভাগের এই বিচারপতি আরও বলেছেন, সংবিধানকে কেবল একটি অক্ষরের দলিল হিসেবে দেখলে হবে না, এর ভেতরের মূল স্পৃহা দিয়ে বুঝতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের ফলে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, এই রায়ের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত হলো।
পূর্ববর্তী রায়ের বিরুদ্ধে করা সব অপিল মঞ্জুর এবং পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে উল্লেখ করে এই রায়ের কার্যকরী অংশে বলা হয়েছে, ‘এর ফলে ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছিল, তা এই রায়ের মাধ্যমে ফের সংবিধানের চতুর্থ ভাগের ২ক পরিচ্ছেদে সক্রিয় ও পুনরুজ্জীবীত করা হলো। এই বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় ও পুনরুজ্জীবীত হলেও তা শর্তসাপেক্ষ। পুনরুজ্জীবীত ৫৮খ(১) ও ৫৮গ(১) অনুচ্ছেদের প্রয়োগ সাপেক্ষে তা কার্যকর হবে।’
আদালত রায়ে বলেছেন, ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ২ক পরিচ্ছেদে বর্ণিত বিধানাবলী কেবলমাত্র ভবিষ্যত প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে কার্যকর হবে।’
ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনের ৫৮খ(১) অনুচ্ছেদটি ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল নিয়ে। এতে বলা ছিল, ‘সংসদ ভাঙিয়া যাইবার পর কিংবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া গেলে যেই তারিখে সংসদ ভাঙিয়া যায় সেই তারিখে, অথবা সংসদ ভাঙিয়া না গেলে যেই তারিখে সংসদের মেয়াদ শেষ হয় সেই তারিখে, একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হইবে।’
আর ৫৮গ(১) অনুচ্ছেদটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, উপদেষ্টাদের নিয়োগ সংক্রান্ত। এতে বলা ছিল, ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন প্রধান উপদেষ্টা ও অনধিক দশজন অন্য উপদেষ্টা থাকিবেন।’
সূত্র কালের কণ্ঠ