শিরোনামঃ

ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ও মুনাফা, জোর নিজস্ব প্রযুক্তিতে

অনলাইন ড্রেস
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ও মুনাফা, জোর নিজস্ব প্রযুক্তিতে
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

 

ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশটি এখন নিজস্ব উৎপাদন ও প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর দিচ্ছে।

 

 

সরকারি ক্রয়নীতি, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে এ খাতে ব্যাবসা ও মুনাফা বাড়ছে।

বিজনেস টুডে ও ডেলয়েটের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ২৬টি কোম্পানির সম্মিলিত মুনাফা ২০২০-২১ অর্থবছরের ৭ হাজার ৫০৭ কোটি রুপি থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৩ হাজার ১১১ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ বছরে মুনাফা বেড়েছে ২০৮ শতাংশ।

 

তবে এই প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট হবে না।

 

 

নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি, জটিল সামরিক ব্যবস্থা নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে।

মুনাফায় বড় উল্লম্ফন

 

ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের কয়েকটি কোম্পানির মুনাফা গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসিই ইকুইটির তথ্য অনুযায়ী, জেন টেকনোলজিসের নিট মুনাফা ২০২০-২১ অর্থবছরের ২ কোটি ৮০ লাখ রুপি থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১৭ কোটি ৯০ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধির হার ৭ হাজার ৭৫৭ শতাংশ।

 

 

একই সময়ে জয়কে এন্টারপ্রাইজেসের মুনাফা বেড়েছে ৭২৭ শতাংশ, অ্যাস্ট্রা মাইক্রোওয়েভ প্রোডাক্টসের ৫৬৯ শতাংশ এবং সোলার ইন্ডাস্ট্রিজ ইন্ডিয়ার ৫০৩ শতাংশ।

 

বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যেও মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। হিন্দুস্থান অ্যারোনটিকসের নিট মুনাফা ৯ হাজার ১১৫ কোটি ৫০ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় ১৮১ শতাংশ বেশি। ভারত ইলেকট্রনিকসের মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ২৩ কোটি ৫০ লাখ রুপি। মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্সের মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪২১ কোটি ৯০ লাখ রুপিতে।

 

 

এই প্রবৃদ্ধির পেছনে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধি এবং দেশীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

দেশীয় কোম্পানিকে অগ্রাধিকার

 

গত সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিষদ প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি রুপির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। এর ৯৮ শতাংশ ভারতীয় কোম্পানির কাছ থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত এ ধরনের অনুমোদিত প্রস্তাবের মোট মূল্য প্রায় ১৩ লাখ কোটি রুপি।

 

ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্য এটি বড় বাজার তৈরি করছে। সরকার দেশীয়ভাবে নকশা করা, উন্নয়ন করা ও উৎপাদিত সরঞ্জাম কেনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং নতুন কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মূল্য প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপি এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। মোট প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বেসরকারি খাতের অবদান বেড়ে প্রায় ২৪ শতাংশ হয়েছে।

 

গত ১০ বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বছরে গড়ে ১৩ শতাংশ এবং রপ্তানি ৪০ শতাংশ হারে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বাজেট ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি রুপি থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ লাখ ৮৫ হাজার কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে।

 

চালকবিহীন বিমান, রাডার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ

 

আধুনিক যুদ্ধে চালকবিহীন বিমান, সেগুলো প্রতিরোধের ব্যবস্থা, উন্নত রাডার, কৃত্রিম উপগ্রহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ভারতের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান অপারেশন সিঁদুরেও এসব প্রযুক্তির গুরুত্ব আলোচনায় এসেছে।

 

সরকারের প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন কর্মসূচি এবং উন্নত প্রযুক্তি উন্নয়ন উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, গবেষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্ত করা হচ্ছে।

 

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন কর্মসূচির আওতায় ৬৭৬টি নতুন ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং উদ্ভাবক যুক্ত হয়েছিল। এ সময় পর্যন্ত নকশা ও উন্নয়নসংক্রান্ত ৫৫১টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

 

এ ছাড়া ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য উন্নত পরীক্ষার অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়েছে। এর ফলে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা এবং উৎপাদনের আগে পণ্যের সক্ষমতা যাচাই করা সহজ হতে পারে।

 

অ্যাস্ট্রা মাইক্রোওয়েভ প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. ভি. রেড্ডির মতে, ভারতীয় কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে শুধু যন্ত্রাংশ তৈরি থেকে জটিল উপব্যবস্থা এবং সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির দিকে এগোচ্ছে। এতে দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার ও পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ার সুযোগ রয়েছে।

 

অ্যাস্ট্রা মাইক্রোওয়েভ কৃত্রিম উপগ্রহ, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যবহৃত উচ্চ কম্পাঙ্কের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গভিত্তিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম তৈরি করে। কোম্পানিটি সম্প্রতি হিন্দুস্থান অ্যারোনটিকসের উত্তম পর্যায়ক্রমিক ইলেকট্রনিকভাবে চালিত রাডার কর্মসূচির জন্য ২ হাজার ২০৫ কোটি রুপির ক্রয়াদেশ পেয়েছে।

 

বড় ক্রয়াদেশ, তবে সরবরাহে চ্যালেঞ্জ

 

ভারতের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর হাতে বড় অঙ্কের ক্রয়াদেশ জমা হচ্ছে। হিন্দুস্থান অ্যারোনটিকসের ক্রয়াদেশের মোট মূল্য প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি রুপি। ভারত ইলেকট্রনিকসের ক্ষেত্রে তা ৭২ হাজার ২৫৮ কোটি রুপি। অ্যাস্ট্রা মাইক্রোওয়েভের নিজস্ব ক্রয়াদেশের মোট মূল্য ২ হাজার ১৫৬ কোটি রুপি।

 

বড় ক্রয়াদেশ ভবিষ্যৎ ব্যাবসার সম্ভাবনা বাড়ালেও তাৎক্ষণিক আয় বা মুনাফার নিশ্চয়তা দেয় না। যুদ্ধবিমান, ডুবোজাহাজ ও জটিল সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগে। উৎপাদনক্ষমতা, যন্ত্রাংশের সরবরাহ, পরীক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য হস্তান্তরের ওপর কোম্পানিগুলোর আয় নির্ভর করে।

 

এরপরও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। বিজনেস টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত নিফটি ইন্ডিয়া ডিফেন্স সূচক প্রায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে নিফটি সূচক প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে।

 

তবে শেয়ারের দাম বাড়লেই কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি একই হারে শক্তিশালী হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ক্রয়াদেশ বাস্তবায়নের সময়, উৎপাদন ব্যয়, মুনাফার হার এবং নগদ অর্থের প্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ।

 

আইজি ডিফেন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বোধিসত্ত্ব সংঘপ্রিয়ার মতে, দেশীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন কর্মসূচি, দেশেই নকশা ও উৎপাদিত সরঞ্জাম কেনার নীতি এবং জরুরি ক্রয়ের ক্ষমতা ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

 

দেশের বাইরে তৈরি যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা কমানোর নীতিও সেই কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিয়েছে, যারা আগে থেকেই দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করেছে। আইজি ডিফেন্সের দাবি, তারা আমদানি করা যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানোর পরিবর্তে নিজস্ব নকশা ও সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে।

 

রপ্তানি হতে পারে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী চালক

 

ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানিতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর অবদান প্রায় অর্ধেক। অথচ দেশের মোট প্রতিরক্ষা উৎপাদনে তাদের অংশ প্রায় ২৪ শতাংশ। এ ব্যবধান দেখায়, বেসরকারি কোম্পানিগুলো রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

অ্যাস্ট্রা মাইক্রোওয়েভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. ভি. রেড্ডির মতে, আগামী দশকে দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, আরও জটিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ হবে শিল্পটির প্রধান লক্ষ্য।

 

এ ক্ষেত্রে সরকারি রপ্তানি সহায়তা, প্রতিরক্ষা ঋণসুবিধা এবং বিদেশে ভারতীয় সরঞ্জামের প্রচার নতুন বাজার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। তবে আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী রপ্তানির অনুমোদন ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করাও প্রয়োজন।

 

ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে প্রথমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত উৎপাদনক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং প্রয়োজনীয় মান বজায় রেখে পণ্য সরবরাহ করতে হবে।

 

সামনে কী

 

ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রবৃদ্ধি এখন সরকারি ব্যয় ও ক্রয়াদেশের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করছে। দেশীয় কোম্পানিগুলো যদি সময়মতো ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করতে পারে, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরি করে, তাহলে এ খাতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকার সুযোগ রয়েছে।

 

তবে বড় অঙ্কের ক্রয়াদেশ ও অতীতের মুনাফা বৃদ্ধি ভবিষ্যতের সাফল্য নিশ্চিত করে না। উৎপাদন ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কোম্পানিগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

সব মিলিয়ে, ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের পরবর্তী পর্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে আমদানি প্রতিস্থাপনের বাইরে গিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জনের ওপর।

জরুরী বিজ্ঞপ্তি: বিঃদ্রঃএই ওয়েব সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।