ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর কাদের ভূঁইয়ার সঙ্গে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বাদানুবাদের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে পুলিশ। অন্যদিকে, ওসির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগে জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রুমিন ফারহানা।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে সরাইল থানায় ওসির কক্ষে এ বাদানুবাদের ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
রুমিন ফারহানার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জাকির হোসেন শুভ জানান, গতকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের প্রতি সম্মান রেখে তারা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ঘটনার রাতেই সরাইল থানায় জিডি করে পুলিশ। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে বিষয়টি জানাজানি হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ আরাফাতুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ওই দিনের ঘটনা উল্লেখ করে একটি জিডি করা হয়েছে। এটি কোনো অভিযোগ নয়। উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশ সাধারণত জিডি করে রাখে।
থানায় ওসির সঙ্গে বাদানুবাদ
গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে সরাইল থানায় গিয়ে ওসির কক্ষে তার সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ওসির বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং শারদীয় দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে তিনি থানায় যান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ৮টার দিকে থানায় গিয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত ওসির কক্ষে অবস্থান করেন রুমিন ফারহানা। এ সময় তার সঙ্গে আসা এক ব্যক্তি ওসির বিরুদ্ধে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন। তবে ওসি ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন। অভিযোগকারীকে রুমিন ফারহানা শিখিয়ে থানায় এনেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
একপর্যায়ে রুমিন ফারহানাকে ওসির উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি স্যার।’ জবাবে ওসি অভিযোগ করেন, রুমিন ফারহানা আওয়ামী লীগের লোকজনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন এবং তাদের গ্রেপ্তারে বাধা দেন। এ বিষয়ে তার কাছে তালিকা রয়েছে বলেও দাবি করেন ওসি। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রাজ্জিকে গ্রেপ্তারে নিষেধ করার অভিযোগও তোলেন তিনি। জবাবে রুমিন বলেন, রাজ্জি আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত।
নিরাপত্তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
রুমিন ফারহানার অভিযোগ, শারদীয় দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গেলে তার নিরাপত্তার জন্য পুলিশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওসি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেননি। এ ছাড়া ওসির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মাটি কাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং ইটভাটা থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
রুমিন ফারহানার কর্মী-সমর্থকদের ভাষ্য, সংসদ সদস্য ও সরাইল থানার ওসির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, রুমিন ফারহানা ও তার পিএস জাকির হোসেন শুভ একাধিকবার ফোন করেও ওসির সাড়া পাননি। দুর্গাপূজার সময় আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরে পুলিশ নিরাপত্তা দিলেও সরাইলে রুমিন ফারহানাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি।
এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নেতাকর্মীদের নিয়ে সরাইল থানায় যান রুমিন ফারহানা। পরে ওসির কক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত কথোপকথন হয়। এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ওসির কক্ষে বসে সংসদ সদস্য, তার পিএস ও নেতাকর্মীরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করছেন। একপর্যায়ে রুমিন ফারহানা ওসির বিরুদ্ধে ইটভাটা, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে ওসি মব সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন এবং ভিডিও কলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কক্ষের পরিস্থিতি দেখান। সেখানে মামলার আসামি আছেন কি না, তা জানতে চান এবং সবকিছু ভিডিও করে রাখতে বলেন।
রুমিন ফারহানাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি মামলার আসামি। আমার বিরুদ্ধে ৮-১০টা মামলা আছে।’ এ সময় ওসিকে আওয়ামী লীগের চোর বলে মন্তব্য করতে শোনা যায়। ওসি পাল্টা অভিযোগ করেন, রুমিন ফারহানা আওয়ামী লীগের লোকজনকে আশ্রয় দেন এবং তাদের ছাড়াতে তদবির করেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, এলাকাটি দাঙ্গাপ্রবণ। কোথাও দাঙ্গা হওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হলে পুলিশ সেখানে যায়। এসব বিষয়ে জানতে এবং নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেই তিনি থানায় গিয়েছিলেন। ওসি তার সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, তা একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সঙ্গে করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার দাবি, রুমিন ফারহানা শত শত লোক নিয়ে থানায় গিয়ে অস্থিরতা তৈরি করেন এবং মব সৃষ্টির চেষ্টা করেন। কয়েকজনকে শিখিয়ে-পড়িয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইটভাটা থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, হাওরের ইটভাটাগুলো পানির নিচে থাকায় সেখান থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের ভিত্তি নেই। পূজার নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরো থানা এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে ওই সময় ব্যক্তিগতভাবে রুমিন ফারহানার সঙ্গে পুলিশের একটি দল রাখা কঠিন ছিল।
রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার না করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও করেন ওসি। তার ভাষ্য, সংসদ সদস্যের করা অভিযোগগুলো সত্য নয়।
এদিকে, সরাইল থানার ঘটনা নিয়ে কোনো মামলা হলে তাকে যেন এক নম্বর আসামি করা হয়—এমন আকাঙ্ক্ষার কথাও জানিয়েছেন রুমিন ফারহানা বলে জানান তার পিএস জাকির হোসেন শুভ।
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
















আপনার মতামত লিখুন :