কুমিল্লায় পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে হাসি বেগম নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে ও নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামী মোসলেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। রবিবার (৯ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জেলার দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সাইচাপাড়া গ্রামে (দাইয়ার বাড়িতে) এই ঘটনা ঘটে।
নিহত হাসি বেগম (৩৫) ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার গোপালনগর গ্রামের মৃত আবদুল খালেক ভূঁইয়ার মেয়ে। এ ঘটনায় স্বামী মোসলেহ উদ্দিনকে আটক করে থানা হেফাজতে নিয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ। আটক মোসলেহ উদ্দিন (৪৫) ওই গ্রামের মৃত রেনু মিয়ার ছেলে। তিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে কুয়েতে ছিলেন।
ছয় মাস আগে তিনি দেশে আসেন। এই দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে। তারা হলেন সাইমন হোসেন (১৯) ও খাদিজা আক্তার (১৬)। সাইমন ঢাকার মিরপুরে থেকে জাপানি ভাষা শিখছেন আর খাদিজা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
নিহতের পরিবারের দাবি, পরকীয়ার জের ও পারিবারিক কলহে প্রায়ই হাসি বেগমের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাতেন মোসলেহ উদ্দিন। ছেলে-মেয়ে ও প্রতিবেশীরা বাধা দিলেও তিনি শুনতেন না। মারধর ও নির্যাতনের ঘটনায় কয়েক দফা বিচার-সালিস হয়েছে। ঘটনার দিন দুপুরে পরকীয়ার জেরে হাসি বেগমকে বেদম মারধর করে মোসলেহ উদ্দিন। মেয়ে খাদিজা আক্তার স্কুল থেকে এসে তার মাকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।
পরে স্থানীয়রা হাসি বেগমকে উদ্ধার করে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত হাসি বেগমের মেয়ে খাদিজা আক্তার বলে, ‘আমার বাবা-মা প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ করত। বাবা মাকে মারধর করতেন, আমরা বাধা দিলেও তিনি শুনতেন না। আজকে আমি স্কুল থেকে এসে দেখি মা ঘরে পড়ে আছেন। ঘরের আসবাবপত্র ওলটপালট হয়ে আছে। মায়ের ঠোঁট ও মুখে রক্তের দাগ। মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে বলেছেন, আমারে খালি ঘরে পেয়ে তোর বাবা মারছে, আমি মরে গেলে তোর নানার বাড়িতে আমারে দাফন করবি। এরপর আর কিছু বলতে পারেনি। পরে প্রতিবেশীরা তাকে ধরে দেবীদ্বার হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
হাসি বেগমের ছেলে সায়মন হোসেন বলে, ‘প্রতিবেশী কুলসুম বেগমের সঙ্গে আমার বাবার পরকীয়া সম্পর্ক রয়েছে। এ নিয়ে ঘরে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। কুলসুম বেগম যা বলে আমার বাবা ঘরে এসে তা-ই করে। এই কুলসুম বেগমের সঙ্গে পরকীয়া করার কারণে মা বাধা দেওয়ায় মাকে মারধর করছে। আমি ঢাকায় থাকি। দুপুরে মা আমাকে ফোন করে মারধরের কথা জানালে আমি আমার এক বন্ধুকে বাড়িতে পাঠাই, সে এসে আমাকে জানায়, মাকে নাকি হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আমি আসতে আসতে আমার মা মারা যান।’
হাসি বেগমের ভাই শাহ পরান বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে বোনের বাড়িতে এসে দেখি গায়ে মারধরের দাগ। গলা ও ঠোঁট ফোলা, চোখের কোনায় রক্তের দাগ। আমার বোনকে নির্যাতন করে মারছে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’
অভিযুক্ত স্বামী মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘দুপুরে আমার গায়ের গেঞ্জি টেনে ছিঁড়ে ফেলায় কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে দুই একটা চড়-থাপ্পড় দিয়েছি এটা সত্য কিন্তু এই চড়-থাপ্পড়ে তো আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার কথা না। আমার এই মারধরে যদি আমার স্ত্রী মারা যায় ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যদি এমন তথ্য আসে, তাহলে আমার যে শাস্তি হয় আমি মাথা পেতে নেব।’
পরকীয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পুরো গ্রামে খবর নেন, আমার কারো সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক আছে কি না। আমি ছয় মাস আগে কুয়েত থেকে এসেছি। আমি ৩৩ বছর কুয়েতে ছিলাম। পরকীয়ার অভিযোগ মিথ্যা।’
দেবীদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘প্রাথমিক সুরতহাল রিপোর্টে নিহত হাসি বেগমের চোখের কোনায় ও গায়ে কিছু মারধরের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মরদেহ উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। নিহতের স্বামী মোসলেহ উদ্দিনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলেছে।’
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।



















আপনার মতামত লিখুন :