শিরোনামঃ

৯৮২৩ মামলা বিচারাধীন জমির শেয়ারে প্রতারণা, ১২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিপাকে ৪০ হাজার ক্রেতা

অনলাইন ড্রেস
৯৮২৩ মামলা বিচারাধীন জমির শেয়ারে প্রতারণা, ১২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিপাকে ৪০ হাজার ক্রেতা
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

জমির শেয়ারে প্রতারণা, ১২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিপাকে ৪০ হাজার ক্রেতা

 

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে জমির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ অবস্থায় তুলনামূলক কম টাকায় জমির অংশীদারত্বের পাশাপাশি ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার আশায় অনেকেই বিনিয়োগ করছেন জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে।

 

 

কিন্তু এই আশাই অনেকের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।

জমির শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন আদালতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় ভুক্তভোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।

 

সুপ্রিম কোর্ট ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব মামলা বিচারাধীন ছিল।

 

 

জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে সাধারণত একটি জমিকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে বিক্রি করা হয়। ক্রেতাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, জমির আনুপাতিক মালিকানার পাশাপাশি তারা একটি করে ফ্ল্যাট পাবেন। তবে জমির মালিকানা নিশ্চিত না করা, অনুমোদনহীন প্রকল্প পরিচালনা এবং একই জমির শেয়ার একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির মতো অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

 

একই জমির শেয়ার একাধিকবার বিক্রির অভিযোগ

 

ঢাকার ১১টি প্রকল্পে জমির শেয়ার ও ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৪৭০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে হোলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে।

 

 

তদন্ত শেষে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হায়দার কবির মিঠুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন।

 

উত্তরখানের একটি প্রকল্পে ১০ কাঠা জমির ৩৬টি শেয়ার বিক্রি করে সেখানে নয়তলা ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

 

এই প্রকল্পের একজন বিনিয়োগকারী আসাদুল ইসলাম রুমন বলেন, ২০২২ সালে তিনি একটি চুক্তি করেন।

 

 

একটি শেয়ারের জন্য তাকে দিতে হয় ১৫ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী, প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর ১ হাজার ২২০ বর্গফুটের একটি করে ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা ছিল। জমি অধিগ্রহণের পর বিনিয়োগকারীরা যৌথভাবে ভবনটি নির্মাণ করবেন বলেও চুক্তিতে উল্লেখ ছিল।

রুমনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি তাদের রাজউকের একটি ভবন নির্মাণের নকশা দেখিয়েছিল, যা পরে জাল বলে জানতে পারেন তারা।

 

রুমন বলেন, ২০২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে ৩৬ জন বিনিয়োগকারীই কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন। পরে তারা জানতে পারেন, একই শেয়ার আরো ৪০ জনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

 

এরপর জমি নিবন্ধন নিয়ে টালবাহানা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীরা জানতে পারেন, প্রকল্পের জমি হিসেবে দেখানোর জন্য ভাড়া করা একটি জমিতে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে হোলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের সাতটি প্রকল্পে ৪৭০ জন গ্রাহক বিনিয়োগ করেন।

 

গত ১৩ অক্টোবর উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। নিরাপত্তাকর্মী মো. জিয়াউল জানান, ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা গত মার্চে কার্যালয়টিতে ভাঙচুর করার পর থেকে সেটি বন্ধ রয়েছে।

 

সরকারি খাসজমিতে আবাসন প্রকল্প

 

সিলেটে স্বপ্নছায়া আবাসনের বিরুদ্ধে ৪০ কাঠা জমিতে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার কথা বলে ১৫০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৯০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির অবস্থান নগরের লামাবাজার এলাকায়।

 

প্রকল্পের একজন বিনিয়োগকারী মহসিন হোসেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে স্থানীয় সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকল্পটির প্রচার চালানো হয়। সেখানে ১০ তলা ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

 

প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিনিয়োগকারীদের ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা ছিল। ২০২০ সালের শুরুর দিকে সব শেয়ার বিক্রি হয়ে যায় বলে জানান তিনি।

 

মহসিন হোসেনের ভাষ্য, জমি নিবন্ধনের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম খায়রুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বারবার সময়ক্ষেপণ করেন। পরে বিনিয়োগকারীরা জানতে পারেন, জমিটি সরকারি খাসজমি।

 

মহসিনের অভিযোগ, কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার সহায়তায় সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসন প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে শামীম ও তার সহযোগীরা বিনিয়োগকারীদের টাকা আত্মসাৎ করেন। পরে প্রকল্পের টাকা নিয়ে শামীম যুক্তরাজ্যে চলে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

সিলেট অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট গ্রুপের চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন বলেন, জমির শেয়ার নিয়ে প্রতারণার বিষয়ে তারা ৫০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছেন। তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা সংগঠনটির সদস্য না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

 

অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই অভিজ্ঞতা

 

ঢাকায় প্রতারণার অভিযোগ থাকা ২০টি ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১৬টি ঘটনায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো রিয়েল এস্টেট ব্যবসার নামে কার্যক্রম চালালেও রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর সদস্য নয়।

 

হোলিস্টিক হোম বিল্ডার্স জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে নিবন্ধিত হলেও রিহ্যাবের সদস্য নয়।

 

আফতাবনগরে ১০০ জনের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে শেয়ার ল্যান্ড বিল্ড হোমের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটিও রিহ্যাবের সদস্য নয়।

 

অন্যদিকে মেরুল বাড্ডায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী আমার বাড়ি আমার ঘরের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৬৫ জন মামলা করেছেন।

 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানেরই আগে ফ্ল্যাট নির্মাণ বা প্লট বিক্রির অভিজ্ঞতা ছিল না।

 

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে-সংলগ্ন এলাকাতেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের ১০০টির বেশি প্রকল্প গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।

 

মুন্সিগঞ্জ জেলা জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, জমির শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগে সেখানে ৫৩৮টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ জড়িত। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২৮৬ জন ব্যক্তি এসব অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

 

আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল আজিজ বলেন, এসব মামলার অনেকগুলো কেরানীগঞ্জ, লৌহজং ও সিরাজদিখান এলাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

 

তিনি বলেন, আবাসনের চাহিদা বাড়ায় ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের আশপাশে এক হাজারের বেশি আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্রগুলো বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে।

 

ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মামলা

 

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮২৩টি মামলার মধ্যে ৫ হাজার ৯৪৮টি ঢাকা মহানগর ও জেলা আদালতে। এসব মামলায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জড়িত।

 

চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ৩৮৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ২৮৬টি এবং সিলেটে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট ২১৩টি মামলা রয়েছে।

 

এ ছাড়া গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

 

আইন থাকলেও কার্যকর প্রতিকার নিয়ে প্রশ্ন

 

রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদ বলেন, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৯ ও ২০ ধারায় নিবন্ধন ছাড়া আবাসন ব্যবসা পরিচালনা এবং অনুমোদনহীন প্রকল্প তৈরি বা বিক্রির বিষয়ে বিধান রয়েছে।

 

তিনি বলেন, আইনের ২৪ ধারায় চুক্তিবদ্ধ সম্পত্তি ক্রেতার অজ্ঞাতে অন্য কারও কাছে অবৈধভাবে বিক্রি করার শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ৩১ ধারায় কোনো কোম্পানি অপরাধ করলে তার মালিক, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

 

প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের প্রতিকার দিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা একটি সেল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ করেন কামাল মাহমুদ।

 

আবাসন প্রকল্প তদারকির দায়িত্ব রাজউকের। তবে সংস্থাটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও উঠেছে।

 

রিহ্যাবের সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেন, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠনটির সদস্য নয়। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে রিহ্যাবের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

 

বিনিয়োগের আগে আবাসন প্রতিষ্ঠানের রিহ্যাবের সদস্যপদ, রাজউকের অনুমোদন এবং জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে রাজউক ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

 

রাজউকের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের সদস্য এবং সংস্থাটির মুখপাত্র মো. শাহিনুর আলম বলেন, অননুমোদিত আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জমির শেয়ারভিত্তিক কয়েকটি অবৈধ প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে। অভিযোগ পেলে রাজউক আরো কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি। তথ্য সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

জরুরী বিজ্ঞপ্তি: বিঃদ্রঃএই ওয়েব সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।