উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র, আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার স্মারক পুণ্ড্রনগরী বগুড়াকে দীর্ঘদিন উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেছেন, গত ২০ বছর ধরে বগুড়ার মানুষ উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস। উন্নয়ন দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে বগুড়ার উন্নয়নে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বগুড়ার মমইন কনভেনশন সেন্টারে বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়া কৃষিতে উদ্বৃত্ত একটি জেলা। এখানে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ সম্ভাবনাময় এই জেলাকে দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। বগুড়াকে শিল্প, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নগরায়ণের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে।
বগুড়ার উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বগুড়া বহুমাত্রিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ চুড়ান্ত পর্যায়ে।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
তিনি আরো বলেন, বগুড়া সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলার উন্নয়নে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পৌরসভাগুলোর জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বগুড়া ওয়াসা ও বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় ডাকবাংলো নির্মাণ ও উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিসিক শিল্প পার্কের কাজও শিগগির শুরু হবে।
বগুড়ার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে বিভিন্ন মহাসড়ক চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যানজট নিরসন ও শহরের সৌন্দর্যবর্ধনে প্রাথমিকভাবে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। যমুনার ভাঙন রোধ, পানি সংরক্ষণে ড্যাম্প স্টেশন নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণেও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। করতোয়া নদীর পাশ দিয়ে চার লেনের সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
জাতীয় উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো দেশকে সমান চোখে দেখেন। রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং গোপালগঞ্জ জেলার উন্নয়নে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নয়, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নই সরকারের লক্ষ্য।
শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়াকে সরকারের ইতিবাচক অর্জন হিসেবে তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা এবার শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী তিনটি পৃথক কর্মসূচিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। এবার অতিরিক্ত ১ হাজার ২০০টি পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছিল বলেও জানান শাহে আলম।
মীর শাহে আলম বলেন, হিন্দুরা কারো পকেটের লোক নয়, গত নির্বাচনে তারা তা প্রমাণ করেছেন। তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমান সরকারও তাদের সেই অধিকার ও মর্যাদার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ উত্তরাঞ্চলের মানুষকে উন্নয়নের নামে ধোঁকা দিয়েছে। মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের সময়ও মানুষ স্বৈরাচারী শাসনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। অতীতের এসব অভিজ্ঞতা ভুলে গেলে চলবে না। বিএনপির নেতাকর্মীদের শুধু গত ১৭ বছরের নির্যাতনের কথা না বলে গত ২০ বছরের নির্যাতন ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
দলের ভেতরেও অপপ্রচার ও হিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, বট-গুপ্ত শুধু আওয়ামী লীগ বা জামায়াতে নেই, নিজেদের দলেও আছে। হিংসা থেকে অপপ্রচার চালিয়ে কোনো লাভ নেই। আসুন, ভালো কাজকে উৎসাহিত করি। বগুড়ার স্বার্থে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক হই।
শহরের যানজট ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিনি বগুড়ার প্রতিটি বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের আহ্বান জানান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করেও মানবিক প্রধানমন্ত্রী জনগণের সঙ্গে মিশছেন, মানুষের কাছে যাচ্ছেন। তাঁর পাশে থেকে বগুড়ার উন্নয়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ইনশাআল্লাহ, আমরা বগুড়াকে এগিয়ে নেব।
সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া দীর্ঘদিন বঞ্চিত থেকেছে। এই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বগুড়ার উন্নয়ন করতে হবে। আমরা তা করব, ইনশাআল্লাহ।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরামের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য দেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুহিত তালুকদার, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ ইসলাম আলমগীর পাভেল, পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ প্রমুখ।
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

















আপনার মতামত লিখুন :