তেরো বছর পেরিয়ে গেল। তবু আদালতে জমা পড়েনি অভিযোগপত্র, শুরু হয়নি বিচারকাজ। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার পর যে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও শোকের স্রোত বয়ে গিয়েছিল, তা আজও স্তিমিত হয়নি। বরং সময়ের ব্যবধানে আরও স্পষ্ট হয়েছে বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া।
রাজনৈতিক প্রভাব, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক নীরবতার অভিযোগে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী (১৭) ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেল ৪টার দিকে শহরের সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে শায়েস্তাখান রোডের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। দুই দিন পর, ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনীর শাখা খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পরবর্তীতে ১৮ মার্চ তিনি তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ক্যাঙারু পারভেজ, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি রাজীব দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন, সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাত বিন ওসমানসহ অজ্ঞাত আরও ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কাছে সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেন।
রফিউর রাব্বির আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে ওই বছরের ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলাটি র্যাবের কাছে হস্তান্তর করে।
পরে র্যাব সংবাদ সম্মেলনে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদের টর্চারসেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে এবং অচিরেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। কিন্তু সেই অভিযোগপত্র আজও আদালতে জমা পড়েনি।
দীর্ঘ ১৩ বছরে মামলাটি ১০১তম ধার্য তারিখ পার করেছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তদন্তে নতুন করে তৎপরতা দেখা যায়। তদন্তকারী সংস্থা র্যাব ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে এবং নতুন করে একজনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করে। তবুও এখনো অভিযোগপত্র জমা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের গতি নিয়ে।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন অবস্থায় শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানের নাম আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে দেননি তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল হাসান (বর্তমানে কারাগারে)।
তার ভাষায়, ‘ক্ষমতায় থাকতে বিচার আটকে রাখতে প্রভাব বিস্তার করেছিল ওসমান পরিবার। ৫ আগস্টের পর যে তৎপরতা দেখা গিয়েছিল, এখন তা নেই। তবুও আশা করছি, হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম দেখতে পাব।’
ত্বকীর মা রওনক রেহানা বলেন, ত্বকী নিখোঁজের পরদিন ৭ মার্চ তার ‘এ লেভেল’ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। পদার্থবিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ পেয়েছিল যা ছিল সারা দেশে সর্বোচ্চ। ‘ও লেভেল’ পরীক্ষাতেও পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে দেশে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল। তাকে ‘এ লেভেল’ শেষে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশের প্রতি গভীর টান থাকায় সে দেশ ছাড়ার কথা ভাবেনি।
মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজল বলেন, ১০১তম ধার্য তারিখেও অভিযোগপত্র জমা না দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে আদালত। কেন বিচারকাজ শুরু হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। বর্তমান সরকারের উচিত দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা।
র্যাব-১১-এর বর্তমান অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।
এদিকে ত্বকী হত্যার পর থেকে বিচার ও চিহ্নিত আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ১৩ বছর ধরে আলোক প্রজ্বালনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। ১৩ বছরেও বিচার শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশের ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তাঁরা দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল ও বিচার প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানান।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ডা. সারোয়ার আলী, অধ্যাপক আহমেদ কামাল, ড. শাহদীন মালিক, সুলতানা কামাল, মফিদুল হক, অধ্যাপক শওকত আরা হোসেন, অধ্যাপক শফি আহমেদ, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, শহিদুল আলম, খুশি কবির, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, ডা. লেনিন চৌধুরী, সোহরাব হাসান, কফিল আহমেদ, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, অরূপ রাহী, কৃষ্ণকলি ইসলাম ও ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ত্বকী হত্যাকাণ্ড দেশব্যাপী যে প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল, তা সমাজে সুশাসন ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। ১৩ বছর পরও বিচার না হওয়া গভীর উদ্বেগের। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে দ্রæত বিচার শুরুর জোর দাবি জানান তাঁরা।
অন্যদিকে, ১৩ বছর পূর্তিতে তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। ৬ মার্চ সকাল সাড়ে ৯টায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর সিরাজ শাহর আস্তানায় ত্বকীর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। ৮ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালিত হবে। এছাড়া ১৪ মার্চ বেলা আড়াইটায় ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ‘ত্বকী সমাবেশ’ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে কথা, গান, নাটক ও ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে।