

*মাসব্যাপী লোকজ সাংস্কৃতিক উৎসব ও গ্রামীণ পণ্য প্রদর্শনী-২০২৬*
*ঐতিহ্যের সুরে বাজল সিরাজগঞ্জ, নাট্য নিকেতনের আয়োজনে জমজমাট উৎসব*
*মোঃ ইনসাফ আলী | সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি | দেশের প্রত্যয়*
*সিরাজগঞ্জ:* লালন-ফকিরের দেশে, যমুনা-বেষ্টিত মাটির গন্ধে আবারও প্রাণ ফিরে পেল লোকজ সংস্কৃতি। সিরাজগঞ্জের প্রাণকেন্দ্রে *নাট্য নিকেতন গ্রুপ থিয়েটার* এর আয়োজনে শুরু হয়েছে *‘মাসব্যাপী লোকজ সাংস্কৃতিক উৎসব ও গ্রামীণ পণ্য প্রদর্শনী-২০২৬’*। ১ সপ্তাহ ধরে চলা এই উৎসব পুরো মাসজুড়ে সিরাজগঞ্জবাসীকে ফিরিয়ে নিচ্ছে শেকড়ের কাছে।
### *উৎসবের উদ্দেশ্য – হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা*
নাট্য নিকেতনের সভাপতি বলেন, “মোবাইল-টিভির যুগে আমাদের পালা-গান, বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি হারিয়ে যাচ্ছে। এই উৎসবের মূল লক্ষ্য—নতুন প্রজন্মকে লোকজ শিল্প-সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করানো। পাশাপাশি গ্রামের কুটির শিল্প, হস্তশিল্পের পণ্যের বাজার তৈরি করা।”
### *উৎসবের আয়োজন – যা থাকছে পুরো মাসজুড়ে*
*১. লোকজ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা:*
প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে মঞ্চ মাতাচ্ছেন দেশের নামকরা বাউল, পালাগানের দল ও যাত্রাপালা শিল্পীরা। লালন গীতি, ভাটিয়ালি, কবিগান, গম্ভীরা, কিচ্ছা গানে মুগ্ধ দর্শক। নাট্য নিকেতনের নিজস্ব নাটক ‘নদের নিমাই’ ও ‘জমিদার বাড়ির কিচ্ছা’ প্রতিদিন হাউজফুল।
*২. গ্রামীণ পণ্য প্রদর্শনী ও মেলা:*
সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলা থেকে আসা ৮০+ স্টলে সাজানো হয়েছে গ্রামীণ পণ্য। শাহজাদপুরের তাঁতের গামছা-লুঙ্গি, বেলকুচির জামদানি, কাজিপুরের মাটির পুতুল, তাড়াশের বেতের ফার্নিচার, উল্লাপাড়ার ঘি-মিষ্টি—সবই পাওয়া যাচ্ছে এখানে। নারী উদ্যোক্তাদের হাতের নকশিকাঁথা, সেলাইয়ের জিনিস দর্শকদের নজর কাড়ছে।
*৩. লোকজ খাবারের স্টল:*
মেলার এক কোণায় বসেছে ‘পল্লীঘর’। সেখানে চিতই-ভর্তা, পাটশাক-চিংড়ি, খই-মুড়ি-নারকেল, খেজুরের রস-গুড়ের পিঠা বিক্রি হচ্ছে। শহরের ছেলেমেয়েরা লাইন ধরে খাচ্ছে দাদি-নানির রেসিপির খাবার।
*৪. শিশু-কিশোর কর্মশালা:*
সপ্তাহের শুক্র-শনিবার বাচ্চাদের জন্য ‘মাটির খেলনা বানানো’, ‘কাগজের ঘুড়ি ওড়ানো’, ‘লোকজ ছড়া আবৃত্তি’ কর্মশালা হচ্ছে। উদ্দেশ্য—শিশুদের হাত-কলমের সাথে রাখা।
*৫. আলোচনা ও সেমিনার:*
প্রতি সপ্তাহে একদিন ‘লোকসংস্কৃতি ও বর্তমান প্রজন্ম’ বিষয়ে আলোচনা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা লোকজ শিল্পের সংরক্ষণ নিয়ে কথা বলছেন।
### *দর্শনার্থী ও শিল্পীদের প্রতিক্রিয়া*
সিরাজগঞ্জ কলেজের ছাত্রী মিতু বলে, “ইউটিউবে বাউল গান শুনতাম। আজ সামনে বসে শুনলাম। মনে হলো মাটির গান এটাই।”
জয়পুরহাট থেকে আসা বাউল শিল্পী ফরিদা বিবি বলেন, “আগে গান গেয়ে পেট চলত না। নাট্য নিকেতন ডেকে সম্মান দিল, মানুষ শুনল। এমন আয়োজন প্রতি জেলায় দরকার।”
শাহজাদপুরের তাঁতি আব্দুল মজিদ বলেন, “মেলায় আমার লুঙ্গি ঢাকার ৩ জন পাইকার কিনেছে। গ্রামের পণ্যের দাম শহরে পাচ্ছি—এটাই বড় পাওয়া।”
### *ভেন্যু ও সময়*
*স্থান:* সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণ ও মুক্তমঞ্চ
*সময়:* প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত
*প্রবেশ:* সম্পূর্ণ ফ্রি। তবে নাটক ও যাত্রার জন্য ২০ টাকার টিকিট
### *শেষ কথা – ঐতিহ্যই ভবিষ্যৎ*
নাট্য নিকেতন গ্রুপ থিয়েটার প্রমাণ করল, সংস্কৃতি শুধু বিনোদন না—এটা মানুষের পরিচয়, অর্থনীতি। এক মাসের এই উৎসব সিরাজগঞ্জকে দিল আনন্দ, গ্রামের মানুষকে দিল বাজার, আর নতুন প্রজন্ম পেল শেকড়ের ঠিকানা।
উৎসবের শেষ দিনে থাকবে ‘লোকজ মেলা ও সাংস্কৃতিক মহাসম্মেলন’ এবং শ্রেষ্ঠ শিল্পী-উদ্যোক্তাদের পুরস্কার বিতরণ।
সিরাজগঞ্জবাসী, দেরি না করে পরিবার নিয়ে ঘুরে আসুন। মাটির গন্ধ নিন, গানে ভাসুন। কারণ ‘যার শেকড় নাই, তার ফলও নাই’।
আপনার মতামত লিখুন :