ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর বাংলাদেশে নতুন এক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এটি দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই নির্বাচনের মূল্যায়ন করেছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ‘বড় পরীক্ষা’ এবং ‘নতুন সূচনা’ হিসেবে।
আলজাজিরা তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছ, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এই নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে।
নির্বাচনটি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং পুনরুজ্জীবিত জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জনমত জরিপে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদে এগিয়ে রাখা হলেও, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট চমক দেখাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে মোট ৩৫০ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ৩০০ জন একক আসনভিত্তিক সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন এবং অতিরিক্ত ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত।
একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ভোট গণনা চলছে, যা ২০২৪ সালে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচন। ৩৫০টি সংসদীয় আসনের জন্য ২ হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তবে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সহিংস নিরাপত্তা দমন অভিযানের কারণে শত শত বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই।
নির্বাচনে মধ্যমপন্থী-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা ছাত্র আন্দোলন থেকে উদ্ভূত একটি দলের সঙ্গে মিলে কাজ করছে।
ফলাফল শুক্রবারের মধ্যে আশা করা হচ্ছে এবং ভোটারদের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি ফেরার ব্যাপক আশা রয়েছে। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোটদান ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রায় এক মিলিয়ন পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভোট দেওয়ার পর এটিকে একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ থেকে মুক্তি এবং ‘নতুন স্বপ্নের পথে যাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এএফপি জানিয়েছে, প্রায় ১০ লাখ নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পাহারার মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সংবাদ সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান তার দলের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
এএফপি নির্বাচনের আগে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ‘তথ্য-সন্ত্রাস’ বিষয়টিকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কোটি কোটি তরুণ ও প্রথমবার ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্যের ‘সুনামি’ ছড়িয়ে পড়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তরুণ ভোটার বা জেন–জির প্রত্যাশাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এ ভোটকে ‘যুগান্তকারী’ উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া এই তরুণেরা মূলত কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং নির্ভয়ে কথা বলার অধিকারের দাবিতে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ ভোটারের এই দেশে প্রার্থীরা যদি আগের মতো পুরোনো ধারার রাজনীতি করেন, তবে তা সফল হবে না। এ ছাড়া কৃষি খাতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মতো গ্রামীণ জনপদের দাবিগুলোও তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ২৪ বছর বয়সী প্রমিলা রানী দাসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘুরা সব সময় একটি ‘ট্যাগ’ নিয়ে বেঁচে থাকে। তারা এমন এক নতুন বাংলাদেশ চায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই মানুষ হিসেবে শান্তিতে বাস করতে পারবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে একটি ভিন্ন ও গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। তাদের মতে, ‘বিপ্লবে জিতেছে জেনারেশন জি, কিন্তু নির্বাচনে রাজত্ব করছে পুরোনো রাজনীতিকেরাই’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণেরা যে নতুন ধারার রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিল, রাজপথের সেই আকাঙ্ক্ষা নির্বাচনের মাঠে পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটেনি। এ ছাড়া নারীদের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে ইসলামপন্থী দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে তরুণদের একাংশের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার অনুভূতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাজ্যের আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের একক সাক্ষাৎকারের ওপর। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ফেরা তারেক রহমানকে আগামীর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে গার্ডিয়ান লিখেছে, তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা আপসহীন নীতির অঙ্গীকার করেছেন।
তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে এবং যেকোনো নতুন সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা আশা করা হচ্ছে। তবে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৩২ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে দ্য হিন্দু অনলাইন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে, ভোটগ্রহণের খবরের পাশাপাশি নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।