চারদিকে বিদঘুটে অন্ধকার, রাত তখন বেশ গভীর। হাতে জ্বালানো মুঠোফোনের আলো ফেলে কবরের জায়গা খুঁড়ছেন মৃতের মেয়ে, দুই বোন ও মেয়ের জামাতাকে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর স্বজন ও গ্রামবাসীকে পাশে না পেয়ে শেষ বিদায়ের আয়োজন করতে গিয়ে তাদেরই খুঁড়তে হয়েছে কবর।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে ঘটে এই ঘটনা।
মানিক পশারীর পরিবার জানায়, প্রশাসনের অনুমতি পাওয়ার পর শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু গ্রামের কেউ এগিয়ে আসেনি।
শেষ পর্যন্ত মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নিজেরাই কবরের জায়গা খুঁড়তে শুরু করেন মানিক পশারীর মেয়ে শিমু পশারী, বোন হাসিনা বেগম ও হেনা বেগম এবং মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেনকে। দিনভর গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে বিরোধ, এরপর নিজ এলাকায় দাফন করতে পারবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে কাটে তাদের সময়। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের উদ্যোগে সমঝোতা হলেও গভীর রাতে কবর খোঁড়ার কাজ করতে হয় পরিবারের তিন নারীকে।
পরিবারের দাবি, মানিক পশারী একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।
তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলার বাদী ছিলেন। তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার পরও দাফন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়। সমঝোতার পর পুলিশ পাহারায় মরদেহ নিয়ে চিতলিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হন স্বজনরা।
মানিক পশারীর মেয়ে শিমু পশারী বলেন, ‘আমার বাবার মরদেহ দাফন করার জন্য আমাকেই মোবাইলের আলো জ্বেলে কবর খুঁড়তে হয়েছে।
গ্রামের কেউ এগিয়ে আসেনি। জামায়াতের লোকজনের ভয়ে কেউ আসেননি বলে আমাদের মনে হয়েছে। কিন্তু আমার বাবাকে তো দাফন করতে হবে। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা।’
মানিক পশারীর বোন হাসিনা বেগম বলেন, ‘রাতে প্রশাসন অনুমতি দেওয়ার পর ভাইয়ের মেয়ে শিমুকে নিয়ে মোবাইলের আলো জ্বেলে কবর খুঁড়তে শুরু করি। এলাকার কেউ এগিয়ে আসেনি। গভীর রাতে অন্ধকারের মধ্যে আমরা কবর খুঁড়েছি। আল্লাহর ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত আমার ভাইয়ের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।’
শনিবার সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মারা যান ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিজ এলাকা ছেড়ে টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর দুপুর ১২টার দিকে তার মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হয়। এরপর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বাধার কারণে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তাদের। পরে বিকেল ৫টার দিকে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
আরো পড়ুন
এইচএসসির ফল প্রকাশ বৃহস্পতিবার, যেভাবে জানবেন
এইচএসসির ফল প্রকাশ বৃহস্পতিবার, যেভাবে জানবেন
মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেন অভিযোগ করেন, শনিবার সকাল ১০টার দিকে তার শ্বশুরের মৃত্যু হয়। দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যান। গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা বলে তাদের বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করানো হয়। এ সময় মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়াই রাখা হয়েছিল। দাফনের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ‘বিরোধিতা’ করেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক। তিনি মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে তাকে গার্ড অব অনার না দেওয়া এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে না দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে।’
পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মানিক পশারীর মরদেহ পুলিশ লাইনসে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা ছিল। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জামায়াতের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দাফনের বিষয়ে সমঝোতা হয়। পরে শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পুলিশ পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।’
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।















আপনার মতামত লিখুন :