ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মায়ের সঙ্গে নানা বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল দুই ভাই-বোন। নতুন জামা, স্বজনদের সান্নিধ্য আর গ্রামের উৎসবমুখর পরিবেশে আনন্দেই কাটছিল সময়।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আনন্দের বাড়ি পরিণত হয় শোকের জনপদে। ছোট ভাইকে বাঁচাতে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে শেষরক্ষা হয়নি বড় বোনেরও।
বুধবার (২৭ মে) রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের মাজারেরপাড় এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রংপুর নগরীর শিরিনপার্ক এলাকার বাসিন্দা রাসেল ও আদুরী দম্পতির সন্তান রুশা মনি (১৫) ও কাইফ (৫) গতকাল মঙ্গলবার মায়ের সঙ্গে নানা বাড়িতে বেড়াতে আসে।
ঈদুল আজহার ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ঢাকায় কর্মরত নানা কাজী ইসলাম ও নানি ছকিনা বেগমও গ্রামের বাড়িতে ফিরেছিলেন। নাতি-নাতনি ও মেয়ের পরিবারের জন্য নতুন কাপড়চোপড়ও কিনে এনেছিলেন তারা।
স্বজনরা জানান, বুধবার দুপুরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া শেষে বাড়ির পাশেই খেলতে যায় দুই ভাই-বোন। একপর্যায়ে বৃষ্টির পানিতে ভরা একটি গভীর গর্তে পড়ে যায় ছোট্ট কাইফ।ভাইকে ডুবে যেতে দেখে তাকে বাঁচাতে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ঝাঁপ দেয় বড় বোন রুশা মনি। কিন্তু সাঁতার না জানায় দুজনেই পানির নিচে তলিয়ে যায়।
স্থানীয় এক শিশুর চিৎকারে বিষয়টি টের পান আশপাশের লোকজন। পরে দ্রুত তাদের উদ্ধার করে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।
ঈদের আগে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে হাসপাতাল ও গ্রামের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
নাতি-নাতনির মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে আহাজারিতে ভেঙে পড়েন নানি ছকিনা বেগম। বুকফাটা কান্নায় তিনি বলেন, ‘মোর সোনা দুইটার জন্যে মুই এত কষ্ট করি, এত কাপড়চোপড় কিনি আনুং। এই কাপড়চোপড় কায় নিবে?’
হাসপাতালে ছেলের নিথর দেহ কোলে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা রাসেল বলেন, ‘বাবারে, তোরা দুই ভাই-বোন মোক ছাড়ি কই গেলু? মুই এখন কাক নিয়ে থাকি? হে আল্লাহ, মুই তোর কাছে কি অপরাধ করছিলুম, কেন মোকে এত বড় শাস্তি দিলি?’প্রত্যক্ষদর্শী মারুফা আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়ে চিৎকার করে বলতেছিল, ‘মা, কাইফ আর রুশা মনি পানির তলে গেছে।’ পরে আমরা দৌড়ে গিয়ে তাদের উদ্ধার করি। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও ডাক্তার জানায়, তারা আর বেঁচে নেই।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আনিচা বেগম বলেন, ‘হাসপাতালে আনার পর শিশু দুটিকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের শরীরে জীবনের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে আনার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।’
এ বিষয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর ছবুর বলেন, ‘ছোট ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে বড় বোনের এমন আত্মত্যাগ সত্যিই ব্যথিত করেছে সবাইকে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যায়। পরিবারের কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
এ সময় তিনি শিশুদের প্রতি আরো সচেতন ও নজরদারি বাড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।


















আপনার মতামত লিখুন :