জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন, রেল ও নৌ-পথকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। একই সঙ্গে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু, সাইকেল শেয়ারিং এবং জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে ঢাকার প্ল্যানার্স টাওয়ারে বিআইপি কনফারেন্স হলে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরা হয়।
এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান।
তিনি বলেন, দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের বড় অংশ আসে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত থেকে, এরপরই পরিবহন খাতের অবস্থান।
তিনি উল্লেখ করেন, একটি মোটরগাড়ি তৈরিতে যে পরিমাণ ধাতু লাগে, সেই একই পরিমাণ ধাতু দিয়ে প্রায় ১৫০টি সাইকেল তৈরি করা সম্ভব, যা পরিবেশবান্ধব পরিবহনের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
তিনি আরো বলেন, জ্বালানি ব্যবহারের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হলে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। পাশাপাশি হাঁটা, অযান্ত্রিক যান এবং বৈদ্যুতিক বাসের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, দেশে পরিবহন ব্যবস্থা ক্রমেই আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌপথ সমন্বয়ে গণ-পরিবহনমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় জাতীয় সংসদে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনকে বিআইপি স্বাগত জানায় এবং তারা কমিটিকে কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
বিআইপির জ্যেষ্ঠ পরিকল্পনাবিদ সৈয়দা মনিরা আক্তার খাতুন বলেন, ১৯৯২ সালের ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়নের সময় করা পরিবহন গবেষণার সঙ্গে বাস্তব পরিকল্পনার সমন্বয় হয়নি। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখা দিলেই দেশের পরিবহন ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি পরিবহন ও নগর পরিকল্পনা খাতে ৩১ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে। উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো- মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরতা কমানো; ইলেকট্রিক বাস ও মিনিবাস চালু; ঢাকাসহ বড় শহরে দ্রুত বিআরটি চালু; আন্তঃজেলা যোগাযোগে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বৃদ্ধি; ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯০ ওয়ার্ডে ১ লাখ সাইকেল নিয়ে শেয়ারিং প্রকল্প চালু; জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড গঠন ও গণ-পরিবহনে ভর্তুকি; বাস আমদানি করে সরকার নিয়ন্ত্রিত সিটি বাস সার্ভিস চালু; গণ-পরিবহনের যন্ত্রাংশে ট্যাক্স কমানো এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ট্যাক্স বৃদ্ধি; স্কুলের সামনে ৫০ মিটারের মধ্যে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ; শহরে নৌ-ট্যাক্সি চালু; খালি ট্রাক চলাচল কমাতে ডিজিটাল অ্যাপ চালু।
বিআইপি বলেছে, রাস্তার ডিজাইন পরিবর্তন করে পথচারী, সাইকেল ও গণ-পরিবহনের জন্য বেশি জায়গা বরাদ্দ দিতে হবে।পাশাপাশি এমআরটি ও বিআরটি স্টেশনকেন্দ্রিক ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (TOD) বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ফুটপাত নির্মাণ, ব্লকভিত্তিক আবাসন পরিকল্পনা এবং স্কুলভিত্তিক নগর উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন যাতায়াত বাসভিত্তিক করা হলে গণ-পরিবহনের প্রতি আস্থা বাড়বে।