শিরোনামঃ

অভিজ্ঞতা নেই, তবু বিদ্যুৎ-জ্বালানি বোর্ডে বাড়তি দায়িত্বে ৮ আমলা

admin5
অভিজ্ঞতা নেই, তবু বিদ্যুৎ-জ্বালানি বোর্ডে বাড়তি দায়িত্বে ৮ আমলা
Getting your Trinity Audio player ready...

 

 

অভিজ্ঞতা নেই, তবু বিদ্যুৎ-জ্বালানি বোর্ডে বাড়তি দায়িত্বে ৮ আমলা

 

সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগে ৩৭টি কম্পানি রয়েছে। এসব কম্পানিতে বোর্ড সদস্য রয়েছেন ৩০৬ জন।

 

 

এ ছাড়া বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যান ও পরিচালকের ১৬৭টি পদেই রয়েছেন আমলারা। তাদের মধ্যে একই ব্যক্তি রয়েছেন একাধিক বোর্ডে। শুধু তাই নয়, বর্তমান আমলাদের পাশাপাশি অনেক প্রভাবশালী সাবেক আমলাও কোনো কোনো বোর্ডে জায়গা নিয়েছেন। বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হচ্ছে, অভিজ্ঞতা না থাকলেও এক সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন অন্য সেক্টরেও।

 

সেই সঙ্গে তাদের কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ সংক্রান্ত নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অর্ধেক শেয়ার রয়েছে এ কম্পানিতে। তাকে খোঁজে পাওয়া গেল গ্যাস ট্রান্সমিশন কম্পানির (জিটিসিএল) বোর্ডেও।তিনি এ কম্পানির পরিচালক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছেন কৃষি সচিব ড. রফিকুল ইসলাম মোহাম্মেদ। তিনি উপসচিব থাকালে বগুড়ার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ছিলেন। বর্তমানে অবসরকালীর ছুটি কাটানোর কথা থাকলেও সরকার ছুটি বাতিল করে তাকে কৃষি সচিব হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি আবার নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কম্পানির (নেসকো) চেয়ারম্যানও।

 

 

অর্থনীতিতে পিএইচডি করা কৃষি সচিব কিভাবে নেসকোর চেয়ারম্যান হলেন কিংবা কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান কার্যনির্বাহীর দায়িত্ব পালনের ফাঁকে তিনি নেসকোর কর্মকাণ্ড কিভাবে পরিচালনা করেন, তা নিয়ে মিলছে না অনেক প্রশ্নের উত্তর।

শুধু কানিজ মওলা ও রফিকুল ইসলাম মোহাম্মেদই নন, তাদের মতো বেশ কয়েকজন আমলা দখলে রেখেছেন একাধিক বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চেয়ারে বসা নাসিমুল গণি দেশের একমাত্র তেল পরিশোধন কম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির (ইআরএল) চেয়ারম্যান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকও বিআর পাওয়ার জোন নামের বিদ্যুৎ উৎপাদন কম্পানির চেয়ারম্যান। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কাঁধে রয়েছে চারটি কম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব।

 

নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সাইফুল ইসলাম দেশের সবচেয়ে বড় তিতাস গ্যাস বিতরণ কম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে তিনি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল), বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কম্পানি (বিসিপিসিএল) এবং বাংলাদেশ চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কম্পানিরও (বিসিআরইসিএল) চেয়ারম্যান।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম পিডিবির বাইরে কতগুলো কম্পানির পরিচালক তা হয়তো তিনি নিজেও মনে করতে পারবেন না। তিনি শুধু বিদ্যুতের নয়, কোনো কোনো জ্বালানি কম্পানিরও বোর্ড মেম্বার। তিনি পাওয়ার গ্রিড কম্পানি (পিজিসিবি), আশুগঞ্জ পাওয়ার, এনডব্লিউপিজিসিএল, বিসিপিসিএল, কোল পাওয়ার জেনারেশন (সিপিজিসিএল), বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ কম্পানি (বিআইএফপিসিএল), তিতাস, বাখরাবাদ গ্যাস কম্পানিরও পরিচালক। সর্বোচ্চ আটটি কম্পানির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা রেজাউল করিমকেও একজন সুপারম্যান বলা যায়।

 

বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজকে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হলেও তিনি এখনো রয়েছেন পিজিসিবি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, এলপিজিএল, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কম্পানির বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদে।

 

কম যান না পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানও। আব্দুল মান্নান জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব থাকার সময় থেকেই বিভিন্ন বোর্ডে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও পিডিবির চেয়ারম্যানের মতো তিনি বিদ্যুৎ কম্পানির কোনো বোর্ডে নেই। এরপরও তিনি বাপেক্স, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কম্পানি (পিজিসিএল), জিটিসিএল, বাখরাবাদ এবং কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কম্পানির বোর্ডে রয়েছেন।বিদ্যুতের ১৫ কম্পানি

বিদ্যুৎ বিভাগে মোট ১৫টি কম্পানি রয়েছে। এসব কম্পানির চারটি যৌথ উদ্যোগে ভারত এবং চীনের রাষ্ট্রীয় কম্পানির সঙ্গে গঠন করা হয়েছে। এসব কম্পানিতে ১৩৬ জন বোর্ড সদস্যের ৫৮ জনই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। সচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন প্রত্যেকটি বোর্ডে। পিজিসিবিতে ৪ জন, আশুগঞ্জে ৪ জন, ইজিসিবিতে ৪ জন, এনডব্লিউপিজিসিএলে ৬ জন, বি আর পাওয়ার জোনে ৫ জন, কোল পাওয়ারে ৫ জন, বিআইএফপিসিএলে ২ জন, ওয়েস্ট জোনে ৪ জন, ডেসকোতে ৬ জন, ডিপিডিসিতে ৭ জন, নেসকোতে ৬ জন, বিসিপিসিএলে একজন, বিসিআরইসিএলে ২ জন, আরপিসিএলে একজন এবং আরএনপিএলে একজন আমলা রয়েছেন।

 

পেট্রোবাংলার ১৪ কম্পানি

পেট্রোবাংলার ১৪ কম্পানিতে ১০৮ বোর্ড সদস্যের ৭০ জনই আমলা। পেট্রোবাংলায় ২ জন, তিতাসে ৫ জন, পিজিসিএলে ৫ জন, সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কম্পানিতে ৬ জন, বাখরাবাদে ৪ জন, কর্ণফুলীতে ৭ জন, বাপেক্সে ৫ জন, বিজিএফসিএলে ৭ জন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডে ৪ জন, জিটিসিএলে ৭ জন, জালালাবাদে ৬ জন, আরপিজিসিএলে ৫ জন, মধ্যপাড়া কঠিন শিলায় ৩ জন এবং বড়পুকুরিয়ায় ৪ জন।বিপিসির ৮ কম্পানি

বিপিসির আট কম্পানির বোর্ড সদস্য ৬২ জনের ৩৯ জনই আমলা। কেউ কেউ সাবেক আমলা। ইআরএলে ৫ জন, পদ্মা অয়েলে ৭ জন, মেঘনায় ৫ জন, যমুনাতে ৩ জন, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টে ৫ জন, এলপিজিএলে ৭ জন, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিকে ২ জন এবং পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কম্পানিতে ৫ জন আমলা রয়েছেন।

 

বোর্ডে মধু

কোনো কোনো বোর্ড মিটিংয়ে ৫০০ ডলার পর্যন্ত সম্মানী দেওয়া হয়। তবে বেশিরভাগ বোর্ডে সম্মানী ৬ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। মাসে কোনো বোর্ডে ৪টি পর্যন্ত মিটিং হয়। এ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ির সুবিধাসহ বৈধভাবে বোর্ড মেম্বাররা অনেক সুবিধা পান। এ ছাড়া অনেকে কম্পানি থেকে নানা সুবিধা নিয়ে থাকেন। কম্পানির কেনাকাটা, প্রকল্প বাস্তবায়ন সব কাজেই বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। সঙ্গত কারণে বোর্ড মেম্বারদের ক্ষমতা দেখানো বা আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে।কম্পানি বাইরের মিটিং করতে হয় ঢাকায়

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের অনেকগুলো কম্পানির প্রধান কার্যালয় ঢাকার বাইরে। বোর্ড মিটিং করতে ঢাকায় আসতে হয় কর্মকর্তাদের। কারণ ঢাকাতেই থাকেন প্রভাবশালী আমলারা। ঢাকার বাইরের বোর্ড মেম্বারদেরও ঢাকায় আসতে হয়। তারা ঢাকায় না আসতে পারলে অনলাইনে রেখেই বৈঠক সারা হয়।

 

কম্পানির কর্মকর্তারা বোর্ডে উপেক্ষিত

কম্পানিগুলোতে যেসব কর্মকর্তা চাকরি করেন তাদের মধ্যে শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালককেই বোর্ডে রাখা হয়। যদিও একটি বা দুটি কম্পানির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। তবে কম্পানির আর কাউকে বোর্ডে রাখা হয় না। ব্যবসা একজনের চালান অন্যরা।

 

সেরাদের সেরা এমন কম্পানির বোর্ড কেমন হয়

ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কম্পানির বোর্ড কেমন হয়, তা জানার চেষ্টা করেছি আমরা। কম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটে বোর্ড মেম্বারদের তালিকার সঙ্গে তাদের পেশাগত তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সেসব বোর্ড সরকারি আমলানির্ভর নয়।ভারতের সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কম্পানি ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) ১২ বোর্ড মেম্বারের ৬ জনই কম্পানির, বাকি ৬ জনের ২ জন সরকার মনোনীত আর ৪ জন স্বাধীন পরিচালক। চীনের নরিনকো গ্রুপের ৯ সদস্যের বোর্ডে ৪ জন কম্পানির, বাকি সদস্যরা বাইরের। আমেরিকান ইলেকট্রিক পাওয়ারের (এএইপি) ১০ সদস্যের বোর্ডে একজন কম্পানির চাকুরে, বাকি সবাই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সাবেক নির্বাহী। বোর্ডে থাকা সারা মার্টিনেজ ২০০৬-২০০৮ সালে মার্কিন শিক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ছিলেন, এখন তিনি সে পদে নেই। ভারত, চীন আমেরিকার কম্পানির বোর্ডগুলো যেখানে কম্পানির প্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত, সেখানে বাংলাদেশের সরকারি কম্পানির বোর্ডগুলো আমলানির্ভর।

 

কম্পানির কর্মকর্তারা যা বলছেন

কম্পানির বোর্ডের বিষয়ে সরাসরি কোনো কম্পানির কর্মকর্তা কথা বলতে সম্মত হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আমলা নিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়। এখন মন্ত্রণালয়ে এমন বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়, উনি বিদ্যুৎ-জ্বালানির কী বোঝেন! বোর্ডগুলো দ্রুত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও পারে না। পেশাজীবীর বদলে কর্মকর্তাকেন্দ্রিক হওয়ায় অনেক প্রস্তাব উত্থাপনের পর বলা হয়, ‘এটা পরে ওঠান।’

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘ওসির কাজ তো ডিসিকে দিয়ে হয় না। আমলাদের কাজ ব্যবসা করা নয়। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে।’ বোর্ডগুলো ভেঙে করপোরেট ধারায় গড়ে তোলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

জরুরী বিজ্ঞপ্তি: বিঃদ্রঃএই ওয়েব সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।