|
Getting your Trinity Audio player ready...
|

*যমুনা সেতু: উত্তরবঙ্গের দুয়ার, বাংলাদেশের গর্ব*
*পূর্ব-পশ্চিম পাড়ের মিলন সেতু, ৪.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর গল্প*
*মোঃ ইনসাফ আলী | সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি | দেশের প্রত্যয়*
*সিরাজগঞ্জ:* যমুনা নদী—এক সময় উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা। সেই বাধা চিরতরে ঘুচিয়ে দিয়েছে এক বিস্ময়— যমুনা সেতু*। সিরাজগঞ্জের পশ্চিম পাড় আর টাঙ্গাইলের পূর্ব পাড়কে জোড়া লাগিয়ে দেয়া এই সেতু শুধু কংক্রিট-স্টিলের কাঠামো না, এটা ২ কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের সেতু।
*সেতুর পরিচিতি – কত লম্বা, কত চওড়া?*
*সেতুর নাম:*যমুনা বহুমুখী সেতু, জনপ্রিয় নাম যমুনা সেতু
*উদ্বোধন:* ২৩ জুন ১৯৮ সাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন।
*অবস্থান:* সিরাজগঞ্জ জেলার পশ্চিম পাড়-ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল এর পূর্ব পাড়-সেতু পূর্ব
*কারিগরি তথ্য:*
1. *দৈর্ঘ্য:* ৪.৮ কিলোমিটার = *১৫,৭৪৮ ফুট*। বাংলাদেশের দীর্ঘতম সড়ক-রেল সেতু
2. *প্রস্থ:* ১৮.৫ মিটার = *৬০.৭ ফুট*। এর মধ্যে ৪ লেনের সড়কপথ ১৪.৮ মিটার এবং ১টি ডুয়েলগেজ রেললাইন
3. *স্প্যান সংখ্যা:* মোট ৪৯টি স্প্যান। প্রতিটি স্প্যান ১০ মিটার লম্বা
4. *পিলার:* নদীর তলদেশে ৫০টি মূল পিলার, যার ভিত গেছে মাটির ৮৩ মিটার গভীর পর্যন্ত
5. *নির্মাণ ব্যয়:* প্রায় ৯৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
*পূর্ব পাড় বনাম পশ্চিম পাড় – দুই পাড়ের চিত্র*
*পশ্চিম পাড় – সিরাজগঞ্জ:*
সেতুর পশ্চিম মাথা সিরাজগঞ্জ শহর থেকে ১০ কিমি দক্ষিণে। এখানে সেতুর টোল প্লাজা, সেতু অফিস, রেল স্টেশন। পশ্চিম পাড়ে সেতুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল। সিরাজগঞ্জের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এখন এই সেতু এলাকা। বিকেলে সেতুর উপর থেকে সূর্যাস্ত দেখতে হাজারো মানুষ ভিড় করে।
*পূর্ব পাড় – টাঙ্গাইল:*
সেতুর পূর্ব মাথা টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে। একে বলে “সেতু পূর্ব”। এখানে বড় টোল প্লাজা, ইলেকট্রিক রেল সাব-স্টেশন ও বিশাল ট্রাক টার্মিনাল আছে। পূর্ব পাড় দিয়ে ঢাকা-উত্তরবঙ্গের সব গাড়ি ঢোকে। সেতু হওয়ার পর ভূঞাপুর এখন টাঙ্গাইলের অন্যতম বাণিজ্যিক হাব।
মাঝখানে বয়ে যাওয়া উত্তাল যমুনা—আর তার বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতু, দুই পাড়ের মানুষকে করেছে এক পরিবার।
*যমুনা সেতুর উপকারিতা – সেতু দিয়েছে যা*
সেতু হওয়ার আগে ফেরিতে নদী পার হতে ৪-৬ ঘণ্টা লাগত। ঝড়-বন্যায় ফেরি বন্ধ। এখন?
*১. যোগাযোগ বিপ্লব:*
ঢাকা থেকে রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুরে যাতায়াতের সময় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মাত্র ১০-১৫ মিনিটে নদী পার। ২৪ ঘণ্টা, ৩৬৫ দিন গাড়ি চলে।
*২. অর্থনৈতিক উন্নয়ন:*
উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য—আলু, পেঁয়াজ, তরমুজ, ধান—এখন কয়েক ঘণ্টায় ঢাকার বাজারে। পরিবহন খরচ ৬০% কমেছে। সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধায় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে।
*৩. রেল যোগাযোগ:*
সেতুর নিচ দিয়ে গেছে ডুয়েলগেজ রেললাইন। ফলে উত্তরবঙ্গের সাথে ঢাকার রেল যোগাযোগ সরাসরি হলো। পণ্য ও যাত্রী পরিবহন অনেক বেড়েছে।
*৪. বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন:*
সেতুর গায়ে দিয়েই ২৩০ কেভি বিদ্যুৎ লাইন ও গ্যাস পাইপলাইন গেছে। উত্তরবঙ্গের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পৌঁছার পেছনে এই সেতুর ভূমিকা সবচেয়ে বড়।
*৫. সামাজিক মেলবন্ধন:*
আগে বিয়ের সম্বন্ধ ভাঙত “নদীর ওপারে” বলে। এখন সিরাজগঞ্জের ছেলে টাঙ্গাইলের মেয়েকে, আর টাঙ্গাইলের ছেলে পাবনার মেয়েকে অনায়াসে বিয়ে করছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা—সবকিছু হাতের নাগালে।
*৬. পর্যটন:*
সেতু নিজেই এখন পর্যটন স্পট। সেতু পশ্চিম পার্ক, রিভার ভিউ পয়েন্টে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক আসে। স্থানীয়দের আয় বেড়েছে।
*স্থানীয়দের কথা*
সিরাজগঞ্জের মাঝি রফিকুল বলেন, “আগে ফেরির জন্য দিনের পর দিন বসে থাকতাম। এখন সেতুর তল দিয়ে নৌকা চালাই, উপর দিয়ে গাড়ি যায়। সেতু আমাদের ভাগ্য খুলে দিছে”।
টাঙ্গাইলের ট্রাক ড্রাইভার সালাম বলেন, “সেতু না থাকলে ঢাকা যাইতে ২ দিন লাগত। এখন ৫ ঘণ্টায় ঢাকা-রংপুর করি। তেল-সময় দুইটাই বাঁচে”।
*শেষ কথা – স্বপ্ন থেকে বাস্তব*
যমুনা সেতু প্রমাণ করেছে—ইচ্ছা থাকলে নদীও বাধা না। ১৫,৭৪৮ ফুট লম্বা, ৬০.৭ ফুট চওড়া এই সেতু শুধু রাস্তা না, এটা উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের মহাসড়ক।
পূর্ব পাড় আর পশ্চিম পাড়—আজ আর আলাদা না। দুই পাড়ের মানুষের বুকের স্পন্দন এখন একটাই নাম—*যমুনা সেতু*।
*টোল হার:* ছোট জিপ গাড়ি৫৫০ টাকা, বাস ৭৫০ থেকে ১০০০ টাকা, ট্রাক ৭৫০ থেকে ১০৫০টাকা
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
















আপনার মতামত লিখুন :