|
Getting your Trinity Audio player ready...
|

*ভোরের যমুনা, কাঁধে জাল: জেলে বাপ্পি চৌধুরীর সংগ্রামের গল্প*
*রাত ৪টায় নদী, বিকেল ৩টায় ঘাট—১৫০ টাকায় চলছে ৫ জনের সংসার*
*মোঃ ইনসাফ আলী | সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি | দেশের প্রত্যয়*
*সিরাজগঞ্জ:* ভোরের আজান শেষ না হতেই যমুনার পাড়ে নৌকা ছাড়ার শব্দ। ঘুম ভাঙে না শহরের মানুষের, কিন্তু জেগে ওঠে যমুনার জেলেপাড়া। সিরাজগঞ্জ সদরের যমুনা নদীর তীর—এখানকার মানুষের জীবন মানে নদী, জাল আর অনিশ্চিত ভাগ্য। আজ শুনবো এমনই এক জেলের কথা—*বাপ্পি চৌধুরী*।
*রাত ৪টা: নদীই যার ঠিকানা*
বাপ্পি চৌধুরী। বয়স ৩৫। বাড়ি যমুনা পাড়ের কালিয়া হরিপুর গ্রামে। প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে টর্চ হাতে ছুটে যান ঘাটে। ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে ওপারে চলে যান মাছ ধরতে।
“ভোরের কুয়াশা, শীত-বর্ষা কিছুই মানি না চাচা। নদী না গেলে পেটে ভাত জুটবে না। ওপারে গিয়ে জাল ফেলি, নৌকা বেঁধে বসে থাকি। স্রোতের টানে জাল ভাসে, মাছ ধরা পড়ে” —বলেন বাপ্পি।
নদীতে থাকেন টানা ১ ঘণ্টা। ফিরে আসেন বিকেল ৩টা থেকে ৩:৪০ এর মধ্যে। রোদ-ঝড়-ঢেউ—সব মাথায় নিয়ে ঘাটে ভেড়ান নৌকা।
*জালে কী ওঠে? দাম কেমন?*
বাপ্পির জালে ধরা পড়ে বাঘার, চিংড়ি, টেংরা, মিরকা, পুঁটি, বাইম—যমুনার চেনা মাছ। দিন ভালো গেলে ২-৫ কেজি মাছ হয়। ঘাটে বিক্রি করেন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়।
“আজ ১৫০০টাকা বিক্রি করলাম। কাল ৬০০টাকাও হয় না। নদীর মর্জি। জাল ছিঁড়ে গেলে ২ হাজার টাকা লাগে সারতে। নৌকার তেল, জালের খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে ৮০-১০০টাকা” —দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বাপ্পি।
*১৫০০ টাকায় ৫ জনের সংসার: কঠিন বাস্তবতা*
বাপ্পির ঘরে স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে আর বৃদ্ধ মা। বড় ছেলে ক্লাস ফাইভে, মেয়ে ক্লাস থ্রিতে। মাসে ঘর ভাড়া ২ হাজার, চাল-ডাল-তেল কিনতেই ৮ হাজার শেষ।
“ছেলেপেলের লেখাপড়া চালানো খুব কষ্টের। খাতা-কলম কিনে দিতে পারি না সময়মতো। মেয়েটা বলে ‘বাবা নতুন জামা কিনে দাও’—টাকা থাকে না। নিজে না খেয়ে ওদের মুখে তুলে দিই। এভাবে জীবনমান অনেক কষ্টের মধ্যে যাচ্ছে” —চোখ ছলছল করে ওঠে বাপ্পির।
বিকল্প আয় নেই। বর্ষায় নদীতে পানি বাড়লে মাছ বেশি ধরা পড়ে। শীতে কুয়াশায় নৌকা ডোবার ভয়। আবার বর্ষা শেষে নদী শুকালে জেলেদের হাতে কাজ থাকে না। তখন ধার-দেনা করেই সংসার চলে।
*জেলেপাড়ার একই চিত্র*
বাপ্পি একা না। যমুনা পাড়ের শত শত জেলের জীবন একই রকম। সরকারি কার্ড আছে অনেকের, ৪০ কেজি চাল পায় ৬ মাস। কিন্তু সেটা দিয়ে মাস চলে না।
স্থানীয় জেলে সমিতির সভাপতি বলেন, “জেলেদের জন্য প্রণোদনা দরকার। জাল-নৌকা কিনতে লোন, ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, বর্ষায় বিকল্প কর্মসংস্থান—এগুলো না হলে ওরা বাঁচবে কিভাবে?”
*বাপ্পির স্বপ্ন*
নৌকা বাঁধতে বাঁধতে বাপ্পি বলেন, “স্বপ্ন বড় না চাচা। ছেলেটা যেন মেট্রিক পাস করে। মেয়েটা যেন লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়। আমি যত কষ্টই করি, ওরা যেন আর জাল না ধরে। শহরে একটা চাকরি করুক”।
কথা শেষ না হতেই আবার জাল গোছাতে শুরু করেন। কাল ভোর ৪টায় আবার যমুনা ডাকবে তাকে।
*শেষ কথা*
ভোরের যমুনা দেখতে সুন্দর। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে বাপ্পিদের ঘাম, কষ্ট, অনিশ্চয়তা লুকিয়ে থাকে। ১৫০০ টাকার মাছে যে সংসার চলে না—এটা শহরের এসি রুমে বসে বোঝা যায় না।
জেলেরা নদী বাঁচায়, দেশের মাছের চাহিদা মেটায়। অথচ তাদের জীবনমান আজও তলানিতে। বাপ্পি চৌধুরীর মতো হাজারো জেলের মুখে হাসি ফোটাতে সমাজ-রাষ্ট্রের দায় কি নেই?
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

















আপনার মতামত লিখুন :