*সুলতানুল আউলিয়ার পবিত্র ছায়: তারাশের হ্যান্ডেল নওগাঁ দরবার শরীফ*
*শত বছরের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, লাখো ভক্তের তীর্থস্থান*
*মোঃ ইনসাফ আলী | সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি | দেশের প্রত্যয়*
*সিরাজগঞ্জ:* চলনবিলের কোল ঘেঁষা সিরাজগঞ্জের *তারাশ উপজেলা*। এখানকার হ্যান্ডেল ইউনিয়নের নওগাঁ গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক শতাব্দী প্রাচীন আধ্যাত্মিক কেন্দ্র—*দরবারে তিশতীয়া*। পবিত্র মাজার গেট পেরোলেই মনে হয় দুনিয়ার কোলাহল থেকে দূরে, প্রশান্তির অন্য এক জগতে প্রবেশ করলেন। এই দরবারের হৃদয়ে শায়িত আছেন *সুলতানুল আউলিয়া হযরত হাজী খাজা শাহ শরীফ জিন্দানী (রাহঃ)*।
হযরত খাজা শাহ শরীফ জিন্দানী (রাহঃ) এর পরিচয়।
ইতিহাস-ঐতিহ্য আর মুরিদানদের বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত খাজা শাহ শরীফ জিন্দানী (রাহঃ) ছিলেন তিশতীয়া তরিকার একজন উচ্চ মর্যাদার অলিয়ে কামেল। “সুলতানুল আউলিয়া” উপাধি তার আধ্যাত্মিক মর্যাদারই সাক্ষ্য দেয়।
জনশ্রুতি আছে, তিনি ভারতের আজমির শরীফ থেকে এদেশে ইসলামের দাওয়াত ও তরিকার প্রচার নিয়ে আসেন। চলনবিল অঞ্চলের মানুষ তখন কুসংস্কার-অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তিনি তাওহিদ, প্রেম, মানবসেবা ও ন্যায়ের শিক্ষা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেন।
“জিন্দানী” উপাধির পেছনে একটি ঘটনা প্রচলিত—বলা হয়, তিনি দীর্ঘদিন রিয়াজত-মোরাকাবায় মগ্ন থেকে “জিন্দা” বা জীবন্ত অবস্থায়ই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন। তার দোয়া-বরকতে এলাকার বহু মানুষ রোগ-বালাই, বিপদ থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে মুরিদানরা বিশ্বাস করেন।
*দরবার শরীফ ও মাজার গেটের বর্ণনা*
*অবস্থান:* সিরাজগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৪৫ কিমি দূরে, তারাশ উপজেলার হ্যান্ডেল ইউনিয়নের নওগাঁ গ্রামে। উল্লাপাড়া-তারাশ সড়ক থেকে ৩ কিমি ভেতরে।
*মাজার কমপ্লেক্স:* মূল মাজার শরীফ শ্বেত-পাথরের গম্বুজ বিশিষ্ট। মাজারের ওপর সবুজ-সোনালী চাদর। পাশেই আছে মসজিদ, খানকা শরীফ, এতিমখানা ও অতিথিশালা।
*পবিত্র গেট:* মাজারে প্রবেশের মূল গেটটিই দৃষ্টিনন্দন। উঁচু তোরণ, আরবি ক্যালিগ্রাফি ও “ইয়া শরীফ জিন্দানী” লেখা। গেট পেরোলেই দুই পাশে বড় বড় তাল-নারকেল গাছ। ভক্তরা গেটে চুমু দিয়ে, মানত করে ভেতরে প্রবেশ করেন।
*পরিবেশ:* পুরো এলাকা জুড়ে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ। ফুলের বাগান, পুকুর আর পাখির ডাক—এখানে এলেই মন জুড়িয়ে যায়।
*বার্ষিক ওরশ ও জিয়ারত*
প্রতি বছর *বাংলা কার্তিক মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার* হযরত খাজা শাহ শরীফ জিন্দানী (রাহঃ)-এর বার্ষিক ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়া সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো ভক্ত-আশেকান ছুটে আসেন।
*ওরশের ৩ দিনব্যাপী আয়োজন:*
১. মিলাদ-কিয়াম, কোরআন খতম ও জিকির-আজকার
২. গরিব-মিসকিনদের মাঝে তবারক বিতরণ
৩. আধ্যাত্মিক আলোচনা ও তরিকার সবক
৪. লাঠি খেলা, কুস্তি ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন
ওরশের দিন মাজারের চারপাশ ৫ কিমি পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। মানতের গরু-ছাগল জবাই, দোয়া-দরুদের মাধ্যমে ভক্তরা মানত পূর্ণ করেন।
*মানুষের বিশ্বাস ও খেদমত*
স্থানীয় বাসিন্দা ৭০ বছরের হাজী আব্দুল গফুর বলেন, “আমার বাবার আমল থেকে এই দরবার দেখছি। বাবা বলতেন, শরীফ শাহর দোয়ায় চলনবিলের ফসল ভালো হয়। আমার ছেলের কঠিন অসুখ এই দরবারে মানত করে ভালো হয়েছে”।
দরবারের বর্তমান খাদেম ও মুতাওয়াল্লি বলেন, “বাবার শিক্ষা ছিল—মানুষকে ভালোবাসো, গরিবের সেবা করো। এখানে জাত-ধর্ম-বর্ণ ভেদ নেই। হিন্দু-মুসলিম সবাই এসে মানত করে, দোয়া নেয়”।
দরবার থেকে পরিচালিত হয় একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসা। সেখানে ৬০+ এতিম ছাত্র বিনামূল্যে লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার সুযোগ পায়।
*শেষ কথা - প্রেমের পাঠশালা*
হযরত খাজা শাহ শরীফ জিন্দানী (রাহঃ)-এর দরবার শুধু একটি মাজার না। এটা প্রেম, সহনশীলতা আর মানবসেবার পাঠশালা। যমুনা-করতোয়া বিধৌত এই অঞ্চলে তিনি যে আলোর মশাল জ্বালিয়ে গেছেন, তা আজও নিভে যায়নি।
পবিত্র মাজার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়—আউলিয়াগণ মরে না, তারা মানুষের হৃদয়ে জিন্দা থাকেন। “জিন্দানী” নামের স্বার্থকতা এখানেই।
সিরাজগঞ্জবাসীর কাছে এই দরবার শরীফ এক অমূল্য সম্পদ। এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ঐতিহ্য ধরে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।