দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় রক্তে এই মাত্রাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর প্রায় চারজনের রক্তে সিসার মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে। তাদের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা পাওয়া গেছে। শিল্পাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী শিশুদের পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের বহুমাত্রিক গুচ্ছ জরিপের (এমআইসিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় রক্তে এই মাত্রাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।
জরিপে দেখা গেছে, শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি বসবাসকারী ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমায় বা তার বেশি। এ ছাড়া গর্ভবতী নারীদের ৭ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তেও সিসার মাত্রা একই পর্যায়ে পাওয়া গেছে।
গর্ভাবস্থায় সিসা মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণের কাছে পৌঁছাতে পারে, যা শিশুর বিকাশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতির হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, বরিশালে ২৯ শতাংশ, রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
শহরের শিশুরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও গ্রামও নিরাপদ নয়।
এমআইসিএসের তথ্য অনুযায়ী, শহরের ৪০ শতাংশ এবং গ্রামের ৩৬ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি।
গবেষকদের ধারণা, শিল্পবর্জ্য, পুরনো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার, দূষিত ধুলা-মাটি, রং, খেলনা ও বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের মাধ্যমে শিশুরা সিসার সংস্পর্শে আসতে পারে। তবে কোন উৎস থেকে কতটা দূষণ ঘটছে, তা নিশ্চিত করতে আরো পরীক্ষা প্রয়োজন।
পরিবেশবাদী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন বলেন, সিসা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শিশুদের মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। ক্ষতি আরো ছড়িয়ে পড়ার আগেই সিসার উপস্থিতি শনাক্ত, দূষণের উৎস চিহ্নিত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসাদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত রক্ত ও পরিবেশগত নমুনা পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং দূষণের উৎসের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সিসাযুক্ত রং ও পণ্যের মানদণ্ড কার্যকর করা এবং শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধ’। সিসার বিষক্রিয়া ঘটার আগেই দূষণের উৎস শনাক্ত করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।