সাগর হত্যা আন্দোলনকে দুর্বার করেছিল ময়মনসিংহে
ময়মনসিংহ নগরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ রেদোয়ান হোসেন সাগরের নামে হওয়া চত্বর। ছবি : সংগৃহীত
২০২৪-এর ১৯ জুলাই। দিনটি ছিল শুক্রবার।
দেশ তখন ছাত্র-জনতার সরকারবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদে ময়মনসিংহ নগরের গাঙ্গিনারপাড় এলাকায় হঠাৎ আওয়ামী লীগের মিছিল।
মিছিলকারীরা ছিল খুবই উত্তেজিত। তাদের আচরণ ছিল উগ্র।
মিছিলটি মিন্টু কলেজের দিক থেকে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের একজন ক্যামেরা পারসন সেটি ধারণ করতে নিজের ক্যামেরা ধরেন। তা দেখে মিছিলের সামনে থাকা একজন উগ্র যুবক দৌড়ে এসে ক্যামেরা পারসনকে লাথি মেরে ফেলে দিলেন। তারপর সামনে এগিয়ে যায় মিছিলটি।
কিছুক্ষণ পর শোনা যায়, মিছিলকারীরা নগরের হরিকিশোর রায় রোড এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। পরে মিছিলটিকে নগরের মিন্টু কলেজ এলাকার দিকে ফিরে যেতে দেখা যায়। এর কিছুক্ষণ পর শোনা যায় একের পর এক গুলির আওয়াজ। ওই গুলিতেই শহীদ হন তরুণ আন্দোলনকারী রেদোয়ান হোসেন সাগর। আন্দোলনে শহীদ ময়মনসিংহের প্রথম শিক্ষার্থী তিনি।
সাগরের মৃত্যুর পর শোকের ছায়া নেমে আসে ময়মনসিংহজুড়ে। তবে সে শোক শুধু শোকের মধ্যেই থাকেনি। সাগর হত্যার পর ময়মনসিংহে আন্দোলন দুর্বার হয়ে ওঠে।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ময়মনসিংহে নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম ছাত্রনেতা গকূল সূত্রধর মানিক। তিনি বলেন, সাগরের মৃত্যু আমাদের অনেক বেশি কষ্ট দেয়। তবে এরপর আমাদের আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। আমরা তখন মৃত্যু ভয় ভুলে যাই। মনে হতো আমার বুকেও গুলি লাগুক। জুলাই আন্দোলনের চেতনা আর শহীদ সাগরের আত্মত্যাগ আমরা কখনও ভুলব না।
জুলাই আন্দোলন ছাত্র আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও ক্রমশ তা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। ময়মনসিংহেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় নানা পেশার মানুষ। মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষ; কবি, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্টরা দ্রুত আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। সকাল সকাল সবাই জড়ো হয়ে যেতেন নগরের টাউন হল মোড়ে। সেখানে সারা দিন চলতে থাকে আগুনঝরা স্লোগান।
কখনো কখনো আন্দোলনকারীদের জনস্রোত নগরজুড়ে মিছিল করত। বাইপাস এলাকায় জড়ো হতো আন্দোলনকারীরা। দিনরাত এক করে তারা ময়মনসিংহের রাজপথ দখল করে রেখেছিলেন।
জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী কবি এহসান হাবীব বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোকে কখনও ভোলা যাবে না। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আমরা কবি-লেখকরাও ছিলাম নগরের রাজপথে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলাম। কাজেই জুলাই আমার কাছে বিপ্লবের নাম। খুবই আবেগের বিষয়। কিন্তু মাত্র দুই বছরেই আমরা জুলাইয়ের ঐক্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছি।’
আন্দোলনকারীরা ছোট-বড় স্বার্থের কারণে নিজেদের মধ্যে চরম বিভেদ সৃষ্টি করে ফেলেছেন। এটি কাম্য ছিল না। আমার স্বপ্ন ছিল জুলাইয়ের ঐক্য নিয়ে নতুন একটি বাংলাদেশ হবে।
জুলাই আন্দোলনে শহীদ সাগরের বাসা ময়মনসিংহ নগরের আকুয়া এলাকায়। তার বাবা আসাদুজ্জামান বলেন, দুই বছর হয়ে গেল। অথচ মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। হাসপাতালে যাবে বলে ওই দিন বিকেলে বাসা থেকে বের হয় সাগর। এরপর চলে যায় মিছিলে। সন্ধ্যার পর একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। জানানো হয় সাগর নিহত হওয়ার খবর।
আসাদুজ্জামান বলেন, আন্দোলনের সহকর্মীরা এখনো আমার ছেলেকে মনে রেখেছেন। তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে আসেন। অনেকেই বাবা বলে ডাকেন। বাবা বলে ডাকলে বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে হয় এইতো আমার ছেলেই বুঝি ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতাও বুঝি। সাগর আর কোনো দিনই ফিরবে না।