মাত্র পাঁচ বছরের শিশু। নাম মো. জায়ান।
বাড়ির সামনে খেলতে বের হয়েছিল প্রতিদিনের মতোই। কিন্তু সেই বের হওয়াই হয় জীবনের শেষযাত্রা। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে ঘিরে দুই দিনের উৎকণ্ঠা, কান্না আর অপেক্ষার অবসান ঘটে এক হৃদয়বিদারক পরিণতিতে। পরিত্যক্ত ডোবায় মেলে তার বস্তাবন্দি মরদেহ।
চট্টগ্রামের পটিয়ায় সংঘটিত এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো জনপদকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মুক্তিপণের লোভে অপহরণ, এরপর হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন একই এলাকার এক পরিবারের তিন সদস্য। আরো চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো শিশুটিকে খুঁজে বের করার নামে অভিযুক্তরাই পরিবারের সঙ্গে দিন-রাত খোঁজাখুঁজির অভিনয় করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ এ ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছে।গ্রেপ্তার তিন জন হলেন–সাইফুদ্দিন (৩৯), শাহানুর আক্তার (৩৫), সাদিয়া সুলতানা নিহা (১৯)।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহান ও ওয়াসিফা নামে আরো দুজনকে আটক করা হলেও প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
নিখোঁজ থেকে মুক্তিপণের চিরকুট
গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে পটিয়া পৌরসভার ৮নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্বপাড়া এলাকায় বাড়ির সামনে খেলছিল শিশু জায়ান। কিছুক্ষণ পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রথমে পরিবারের ধারণা ছিল, হয়তো সে পুকুরে পড়ে গেছে।
শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। ঘরের বিছানায় পাওয়া যায় হাতে লেখা একটি চিরকুট। সেখানে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং পরিবারের একটি মোবাইল ফোন আনলক অবস্থায় নির্দিষ্ট স্থানে রেখে যেতে বলা হয়। এই চিরকুটই পরে হয়ে ওঠে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের প্রধান সূত্র। হাতের লেখা মিলিয়ে বেরিয়ে আসে ভয়ঙ্কর তথ্য।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা চিরকুটের হাতের লেখা, স্থানীয় তথ্য, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি এবং প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান একত্রে বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা দ্রুত সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করেন।
পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে পটিয়া থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যৌথ অভিযানে একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার করা হয় জায়ানের মরদেহ। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে জায়ানকে দাফন করা হয়। জানাজায় অংশ নেন হাজারো মানুষ। এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শিশুর পিতা মো. শাহজাহান বাদী হয়ে পটিয়া থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় সাদিয়া সুলতানা নিহা, তার বাবা সাইফুদ্দিন ও মা শাহানুর আক্তারকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরো ২-৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যারা খুঁজছিল, তারাই ছিল হত্যাকারী
নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তরাই সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখাচ্ছিল। তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে শিশুটিকে খোঁজার কাজে অংশ নেয়, পরিবারকে সান্ত্বনা দেয় এবং আশপাশে অনুসন্ধান চালায়।
এ ঘটনায় শোকাহত এক স্বজন বলেন, আমরা ভাবতেই পারিনি, যারা আমাদের সঙ্গে সারারাত জায়ানকে খুঁজেছে, তারাই ওকে মেরে ফেলেছে। টাকার জন্য একটা নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। এই তথ্য প্রকাশের পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।
একটি পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ
জায়ান ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শিশুটির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শত শত মানুষ তাদের বাড়িতে ভিড় করেন। মায়ের আহাজারি আর বারবার জ্ঞান হারানোর দৃশ্য উপস্থিত মানুষকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। অন্যদিকে নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন বাবা। সন্তান হারানোর এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলেও মন্তব্য করেন স্বজনরা।
স্থানীয়রা জানান, একটি পরিবার শুধু সন্তান হারায়নি, হারিয়েছে তাদের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
পটিয়াজুড়ে ক্ষোভ, বিচার দাবিতে বিক্ষোভ
ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। মিছিলটি পটিয়া থানার সামনে গিয়ে শেষ হয়।
নিহত জায়ানের মামা মো. ওয়াজেদ আলী জিসান বলেন, আমরা তাদের দাবির তিন লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছিলাম। প্রয়োজনে আরো বেশি টাকা দিতে প্রস্তত ছিলাম। কিন্তু অপহরণকারীদের পক্ষ হতে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি। আমরা সারাদিন অপেক্ষা করে উপায় না পেয়ে রাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিয়েছি।পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হত্যার প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনায় আর কারা জড়িত ছিল এবং অপহরণের পর কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে এসব বিষয় উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে রিমান্ড চাওয়া হবে।
পটিয়ার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়
মুক্তিপণের লোভে অপহরণ, বিশ্বাসের আড়ালে প্রতারণা, আর শেষ পর্যন্ত নিষ্পাপ এক শিশুর নির্মম মৃত্যু জায়ান হত্যাকাণ্ড এখন পটিয়ার মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়া এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। আইনের বিচার একদিন সম্পন্ন হবে, অপরাধীরা শাস্তিও পাবে। কিন্তু যে শিশুটি প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির সামনে খেলত, বাবা-মায়ের কোলজুড়ে হাসি ছড়াত, সেই ছোট্ট জায়ান আর কখনো ফিরে আসবে না। তার শূন্যতা বহন করে বেঁচে থাকতে হবে একটি পরিবারকে, আর এই বেদনা মনে করিয়ে দেবে লোভ যখন মানবতাকে গ্রাস করে, তখন সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় নিরপরাধীদের।