মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি যখন চরম উত্তপ্ত, চারদিকে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলার সতর্কতা—ঠিক সেই মুহূর্তে পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে ভেসে থাকা একটি জাহাজের নেভিগেশন ব্রিজে ধ্বনিত হলো ঈদের তকবির। স্বজনদের থেকে হাজার মাইল দূরে, যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে থেকেও ধর্মীয় আচার আর ভ্রাতৃত্বের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করলেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ বাংলার জয়যাত্রার ৩১ জন নাবিক।
শুক্রবার (২০ মার্চ) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় জাহাজটির নেভিগেশন ব্রিজে ঈদের নামাজ আদায় করেন নাবিকেরা। বাইরে ছিল হালকা বৃষ্টি আর দমকা হাওয়া।
যুদ্ধের আবহে চারদিকে চাপা উত্তেজনা থাকলেও নামাজের সময়টুকু ছিল পরম প্রশান্তির।
বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, ড্রোন হামলার সতর্কতা থাকলেও কোনো বিস্ফোরণের শব্দ তাদের উৎসবে বাধা হতে পারেনি।
পরিবার থেকে দূরে থাকলেও খাবারের আয়োজনে ছিল আভিজাত্য। দিনটি আনন্দময় করতে নাবিকদের জন্য ছিল বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা।
সকালের নাশতায় সেমাই, নুডলস, খেজুর, ডিম ও জুস। দুপুরের বিশেষ ভোজ এ ছিল পোলাওয়ের সাথে উটের মাংস, গরুর মাংস এবং স্পেশাল স্মোকড ফিশ।
খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই মিলে ছবি তোলা, আড্ডা, গান শোনা আর সিনেমা দেখে সময় পার করেছেন তারা। পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে যুদ্ধের মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করেছেন প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসানসহ অন্য নাবিকেরা।
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত অবরুদ্ধ। বিশ্বজ্বালানির অন্যতম প্রধান এই রুটটি ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছে জাহাজটি।গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতার থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল কেন্দ্রিক সংঘাত। ১১ মার্চ পণ্য খালাস করে ফেরার চেষ্টা করলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি জাহাজটি।
বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালি এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম। কবে নাগাদ প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরতে পারবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এই অনিশ্চয়তা আর যুদ্ধের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই বাংলাদেশি নাবিকেরা একে অপরের হাত ধরে ভাগ করে নিয়েছেন ঈদের আনন্দ।
ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সকালে হালকা বৃষ্টি ছিল, বাতাসও ছিল কিছুটা বেশি। মিসাইল–ড্রোনের সতর্কবার্তা এলেও কোনো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়নি। নাবিকেরা সকালে ঈদের নামাজ শেষে একসঙ্গে ছবি তোলেন। দিনটি কাটছে গান শোনা, সিনেমা দেখা আর আড্ডায়। ঈদের দিন এমনিতেই আমরা জাহাজে আনন্দ করি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে আমরা বের হতে পারছি না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছি।
সূত্র কালের কণ্ঠ