ভোলার মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা না পেয়ে র্যাম্পে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে হাম আক্রান্ত শিশুদের। শনিবার তোলা। কালের কণ্ঠ
শয্যা বেড়েছে। তবে অবকাঠামো, জনবল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রয়ে গেছে আগের মতোই।
ফলে ধারণক্ষমতার তিন গুণ রোগীর চাপে দ্বীপবাসীর একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রটি এখন নিজেই রোগী।
উপজেলা প্রতিষ্ঠার চার দশক পেরিয়ে গেলেও ভোলার নদীবেষ্টিত উপজেলা মনপুরার সরকারি হাসপাতাল এখনও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ২০১৪ সালে সেটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়।
তবে শয্যা বাড়লেও অবকাঠামো, জনবল ও সুযোগ-সুবিধা রয়ে গেছে আগের মতোই। ফলে ধারণক্ষমতার তিন গুণ রোগীর চাপে দ্বীপবাসীর একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রটি এখন কাবু।
সূত্র জানায়, হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন স্তরে ১২৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪৮ জন। এর মধ্যে ৩৪ জন চিকিৎসের মধ্যে কাগজে-কলমে ৯ জনের পদায়ন থাকলেও বাস্তবে চিকিৎসা দিচ্ছেন মাত্র চারজন।
বাকিরা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে নানা অজুহাতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এ অবস্থায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সূত্র আরো জানায়, হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের ৩৪টি পদের মধ্যে ২৫টিই শূন্য। নার্স ও মিডওয়াইফের ৩০টি পদের বিপরীতের কর্মরত রয়েছেন ১৮ জন। তৃতীয় শ্রেণির ৩৭টি পদের ২৫টি ও চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের ১৪টি পদ শূন্য।
হাসপাতালের ইনডোরে প্রতিদিন গড়ে ৭৫ জন রোগী ভর্তি হয় এবং আউটডোরে গড়ে প্রতিদিন চিকিৎসা নিয়ে থাকেন ৩০০ রোগী।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সরেজমিন মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো ভবনের দোতলায় তিনটি ওয়ার্ডে কোনো শয্যা খালি নেই। হাসাতালের মেঝে, বারান্দা ও সিঁড়ির র্যাম্পে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী রোগীদের। রোগীদের শয্যার পাশে ও হাসপাতালটির সিঁড়িতে ময়লা-আবর্জনা থাকায় দুর্গন্ধের মধ্যেই চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা।
দেখা যায়, হাসাপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে বেশি শিশু রোগী। তাদের অধিকাংশই হাম ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। হামে আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে পাশাপাশি শয্যায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।
এদিকে, নতুন ভবনের নিচতলার আউটডোরে শতাধিক রোগী সারিতে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। বিভিন্ন চর থেকে আসা এসব রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন মাত্র দুইজন চিকিৎসক। দীর্ঘক্ষণ সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কলাতলী চরের বাসিন্দা মো. ফারুক জানান, তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তিনি। তিনজনই হামে আক্রান্ত। তবে হাসাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। তাই র্যাম্পে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুরা। মেঝেতে বিছানোর জন্য হাসপাতাল থেকে ফোমের একটি শয্যা দেওয়া হলেও বিছানার চাদর দেওয়া হয়নি।
হাজিরহাট ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সোনারচর এলাকার বাসিন্দা মো. শাহাদাত জানান, তার দুই বছর বয়সী ছেলের ডায়রিয়া হওয়ায় শুক্রবার সকালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তবে শয্যা না পাওয়ায় র্যাম্পে বিছানা করে দেওয়া হয়েছে শিশুটির জন্য।
শাহাদাতের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার মতো কোনো পরিবেশ নেই। চারদিকে ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ। র্যাম্পে বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় গরমে শিশুদের নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা চরফৈজুদ্দিন গ্রামের বাসিন্দা মো. ইলিয়াস জানান, তিনি পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। শয্যা খালি না থাকায় হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে। প্রতিদিন একজন চিকিৎসক এসে দেখে যান। এছাড়া আর কোনো সেবা তারা পান না। তিনি বলেন, হাসপাতালের যে পরিবেশ তাতে চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কবির সোহেল বলেন, হাসপাতালটি ৫০ শয্যার হলেও মূলত আগের ৩১ শয্যায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। নানা সংকটে বাকি ১৯ শয্যা চালু করা যায়নি। ফলে রোগীদের মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
ডা. কবির জানান, হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮০ জনের ওপর রোগী ভর্তি থাকেন, বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নেন তিন শতাধিক। তিনি বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন পদের মধ্যে ৬১ শতাংশ পদই খালি। তার পরও মাত্র চারজন চিকিৎসক দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।