নাগর পাটোয়ারীর চরের অবস্থান ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনা নদীর মাঝে। চরের পূর্ব বিশারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭৫ জন।
শিক্ষক মাত্র একজন। গত ছয় মাসে একদিনও পাঠদান হয়নি এ বিদ্যালয়ে। দায়িত্বরত শিক্ষক মো. বাবলু মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ে এলেও হয় না পাঠদান।
শুধু পূর্ব বিশারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, জেলার বিচ্ছিন্ন চরগুলোর প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ।
সরকারি হিসাবের খাতায় চরগুলোতে বিদ্যালয় রয়েছে, তবে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত সেখানকার শিশুরা।
সম্প্রতি পূর্ব বিশারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায় সেখানকার অফিসকর্মী মো. কবিরকে। সকাল ৯টায় বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে ৯টার দিকে বিদ্যালয়ের বারান্দা ঝাড় দিচ্ছিলেন তিনি। তখনো কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসেনি।কিছুক্ষণ পর স্থানীয় কয়েকজন শিশুকে বাড়ি থেকে ডেকে আনেন কবির।
ডেকে আনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সালমা ও মো. নূর হোসেন নামের দুইজন জানায়, চলতি বছর ভর্তির পর থেকে মাত্র দুই দিন তাদের ক্লাস হয়েছে।
চরের বাসিন্দা মো. ফিরোজ আলম জানান, চরে অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, কিন্তু শিক্ষক নেই। পূর্ব বিশারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন মাত্র শিক্ষক। মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ে আসেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি মিড-ডে মিলের যে খাবার আসে, তা পাশের মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়।
মো. নোমান হাওলাদার নামের অপর এক বাসিন্দা জানান, বিদ্যালয়টিতে গত ছয় মাসে একদিনও ক্লাস হয়নি। একজন শিক্ষক রয়েছেন। তিনি সপ্তাহে এক-দুইদিন থাকেন, আবার চলে যান। তার অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি যে খাবার আসে, তার মধ্যে কিছু স্থানীয় মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়। বাকি খাবার নানা অজুহাতে শিক্ষক বাবলু নিয়ে যান।
স্থানীয়রা জানান, তারা বিদ্যালয়ের পড়ালেখার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নিলেও শিক্ষকদের অনীহার কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
তবে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বাবলু জানান, তিনি একাই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক। বিভিন্ন সময় দাপ্তরিক কাজে উপজেলায় থাকতে হয়। এ সময় পাঠদান বন্ধ থাকে। মিড-ডে মিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চরের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে তেমন উপস্থিত থাকে না। তাই নষ্ট হয়ে যাবে বিধায় মিড-ডে মিল পাশের মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়।’
তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ফারাজানার চরে অবস্থিত চর জহির উদ্দিন রেড ক্রিসেন্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে ৭৫ জন শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়টিতে একজন মাত্র শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু তিনিও অধিকাংশ সময় আসেন না। তার পরিবর্তে কলেজপড়ুয়া শাকিল নামের স্থানীয় এক যুবককে দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে কলেজ পড়ুয়া যুবক মো. শাকিলকে ক্লাস নিতে দেখা যায়। শাকিল জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রাকিবুল ইসলাম তাকে ক্লাস পরিচালনার জন্য রেখেছেন। তিনি চরের শিশুদের কথা চিন্তা করে সহযোগিতা করেন। বিনিময়ে বেতন থেকে তাকে মাসে কিছু সম্মানি দেন শিক্ষক রাকিব।স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউপি সদস্য মো. তসলিম উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, একজন শিক্ষকের পক্ষে একটি বিদ্যালয় চালানো সম্ভব না। এছাড়া বিদ্যালয়টি একটি টিনের ঘরে পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি ভবন নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. রাকিবুল ইসলামের দাবি, তাকে বিদ্যালয়ের কাজে প্রায়ই উপজেলা সদরে থাকতে হয়। তাই শাকিল নামের স্থানীয় এক যুবক তাকে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেন।
উপজেলার চর লাদেনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে অবস্থিত মোহাম্মদ ভেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম চলছে একটি টিনের ঘরে। বিদ্যালয়ের তিনটি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন একজন মাত্র শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রনি কর্মকার জানান, তার বিদ্যালয়ে ছয়জনের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন তিনজন। এর মধ্যে চলতি বছরের শুরু থেকেই একজন অনুপস্থিত। আরেকজন পারিবারিক কাজে ছুটিতে রয়েছেন। তাই তিনি একাই তিনটি শ্রেণির পাঠদান করেন। বিদ্যালয়টিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও ভবন নির্মাণের দাবি জানান।
এদিকে, শিক্ষক সংকটে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের চর মোজাম্মেলে অবস্থিত পশ্চিম রামদেবপুর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় ও চর মোজাম্মেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এর মধ্যে পশ্চিম রামদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাতজনের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন তিনজন। এর মধ্যে একজন প্রশিক্ষণে থাকায় ৭১ জন শিক্ষার্থীর ক্লাস নিতে হয় দুইজন শিক্ষককে।
চর মোজাম্মেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শ্রেণি কার্যক্রম চলছে একজন শিক্ষক দিয়ে। সেখানে চারজন শিক্ষক থাকলেও একজনকে ডেপুটেশনে অন্য প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে, একজন পিটিআই প্রশিক্ষণে রয়েছেন এবং একজন ছুটিতে। তাই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুমন চন্দ্র দাসকে একাই সামলাতে হচ্ছে ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তজুমদ্দিন উপজেলার চর মোজাম্মেল ও চর জহির উদ্দিনে মোট ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৫৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৯ জন শিক্ষক অর্থাৎ ৩০টি পদ শূন্য।ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার বুকে জেগে ওঠা অর্ধশতাধিক বিচ্ছিন্ন চরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা নিয়ে সরকারি পৃথক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও এবং উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এসব চরে দুই লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। তারা মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে জীবন ধারণ করেন।
শিশুদের শিক্ষার জন্য জেলার অর্ধশতাধিক দুর্গম চরে ৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যার শিক্ষার্থী সংখ্যা আট হাজার ৫২১ জন। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবসহ নানা সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে চরের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম।
এদিকে সরেজমিনে ভোলার দৌলতখান উপজেলার মেঘনা নদীর মাঝে অবস্থিত মদনপুর ইউনিয়নে প্রাথমিক শিক্ষার একই অবস্থা দেখা যায়। সেখানে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে দুই-একজন ছাড়া বাকিরা বিদ্যালয়ে নিয়মিত নন। আবার কোনোদিন এলেও সকালে এসে দুপুরের আগেই চলে যান। এতে পাঠাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সেখানকার শিক্ষার্থীরা। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার না হতেই ঝরে পড়ছে তারা।
চরে অবিস্থত চর পদ্মা মকবুল আহমেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শিহাব উদ্দিন জানান, চরে শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। একেকটি বিদ্যালয়ে দুই-তিনজন শিক্ষক দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তার বিদ্যালয়ে গত বছর পঞ্চম শ্রেণিতে ১৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র দুইজন। অভিভাবকদের অনেক বুঝিয়েও তাদের পরীক্ষায় বসানো যায়নি।
তজুমিদ্দন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রিয়াজ আলম কালের কণ্ঠকে জানান, মেঘনা নদীর মাঝে অবস্থিত চর মোজাম্মেল ও চর জহির উদ্দিনে মোট ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৬৬। সেখানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলে চরাঞ্চলের পদায়ন করা হবে। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিষয়ে আমার কাছে অভিযোগ এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি জেনে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলেছি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’