বনোয়ারী লাল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: শতবর্ষী ঐতিহ্যের আলো-আঁধার
সিরাজগঞ্জের গৌরবময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, ভালো-মন্দ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন
মোঃ ইনসাফ আলী | সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি | দেশের প্রত্যয়
সিরাজগঞ্জ:সিরাজগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বনোয়ারী লাল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি স্কুল না, এটা সিরাজগঞ্জের শিক্ষা-সংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় কয়েক প্রজন্মের ছাত্র তৈরি করেছে—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আমলা, রাজনীতিবিদ। কিন্তু শতবর্ষী ঐতিহ্যের পাশাপাশি আছে জীর্ণ ভবন আর আধুনিকায়নের চ্যালেঞ্জও।
*স্থাপিত কবে? – ইতিহাসের পাতা থেকে*
বিদ্যালয়ের রেকর্ড ও স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, *বনোয়ারী লাল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯সালে*। তৎকালীন সিরাজগঞ্জের বিশিষ্ট দানবীর বনোয়ারী লাল রায়চৌধুরীর নামে এর নামকরণ করা হয়। শুরুতে এটি একটি জুনিয়র ইংলিশ স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯২০ সালে হাইস্কুলে উন্নীত হয় এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৩ সালে জাতীয়করণ হয়ে ‘সরকারি’ মর্যাদা পায়।
১৩৫ বছরের পুরনো লাল ইটের ভবন, বিশাল খেলার মাঠ আর বটগাছের ছায়া—এই স্কুলের প্রতিটি ইট যেন ইতিহাসের গল্প বলে।
ভালো দিক – যা নিয়ে গর্ব করা যায়
১. ঐতিহ্য ও সাফল্য:
এই স্কুল থেকে পড়ে বেরিয়েছেন অসংখ্য কৃতি সন্তান। এসএসি ও এইচএসি পরীক্ষায় প্রতি বছর জেলার শীর্ষ ফলাফল এখান থেকেই আসে। বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, স্কাউট—সহশিক্ষা কার্যক্রমে সিরাজগঞ্জে বনোয়ারী লালের জুড়ি নেই।
২. অভিজ্ঞ শিক্ষক প্যানেল:
বিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ ও মেধাবী শিক্ষকমণ্ডলী আছেন। অনেকে ২০-২৫ বছর ধরে এখানে পড়াচ্ছেন। গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজিতে শিক্ষকদের দক্ষতা জেলাব্যাপী প্রশংসিত।
৩. খেলাধুলা ও সাংস্কৃতি:
বিশাল মাঠের কারণে ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্সে স্কুলের সুনাম আছে। প্রতি বছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় জাঁকজমকভাবে।
৪. প্রাক্তন ছাত্রদের নেটওয়ার্ক:
‘বনোয়ারী লাল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ সক্রিয়। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তনীরা স্কুলের উন্নয়নে টাকা-পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন।
মন্দ দিক ও চ্যালেঞ্জ – যা সমাধান দরকার
১. জীর্ণ ভবন ও অবকাঠামো সংকট:
১৩৫ বছরের পুরনো ভবনের অনেক অংশই ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টি হলে ক্লাসরুমে পানি পড়ে। আধুনিক ল্যাব, ডিজিটাল ক্লাসরুম, কম্পিউটার ল্যাবের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম। শিক্ষার্থী ২ হাজারের বেশি, কিন্তু বেঞ্চ-চেয়ার-টয়লেট অপ্রতুল।
২. শিক্ষার্থীর চাপ:
সুনামের কারণে ভর্তির চাপ প্রচণ্ড। এক শ্রেণিতে ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থী ক্লাস করতে বাধ্য হয়। এতে পাঠদানের মান কিছুটা ব্যাহত হয়।
৩. আধুনিকায়নের ঘাটতি:
‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এর যুগে স্কুলে ওয়াইফাই, প্রজেক্টর, সিসি ক্যামেরা সীমিত। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের আরও প্রশিক্ষণ দরকার বলে অভিভাবকরা মনে করেন।
৪. খেলার মাঠ দখল বিতর্ক:
মাঝে মাঝে মাঠের এক অংশে অনুষ্ঠান-মেলা বসায় খেলাধুলা ব্যাহত হয়। মাঠ রক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন প্রাক্তনীরা।
প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যা বলছেন
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “বনোয়ারী লালের ঐতিহ্য আমরা ধরে রেখেছি। সরকারের সহায়তায় নতুন ভবনের কাজ প্রক্রিয়াধীন। ডিজিটাল ক্লাসরুম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পুরনো ঐতিহ্য রেখেই আধুনিক স্কুল গড়তে চাই।”
দশম শ্রেণির ছাত্র রাফি বলে, “স্যাররা খুব ভালো পড়ান। কিন্তু ক্লাসে বসার জায়গা কম। নতুন ভবন হলে আরও ভালো হতো।”
শেষ কথা – ঐতিহ্য রেখে আধুনিকতার পথে
বনোয়ারী লাল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সিরাজগঞ্জের গর্ব। এর ১৩৫ বছরের ইতিহাস, কৃতি শিক্ষার্থী আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কোনো কিছু দিয়েই মাপা যাবে না। কিন্তু সময়ের সাথে তাল মেলাতে অবকাঠামো ও প্রযুক্তির উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, প্রাক্তন ছাত্র ও অভিভাবকরা মিলে কাজ করলে এই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান আবারও নতুন রূপে মাথা তুলে দাঁড়াবে। ঐতিহ্য থাকবে ভিত্তিতে, আর আধুনিকতা থাকবে ছাদে—এমন বনোয়ারী লালই চায় সিরাজগঞ্জবাসী।