ফরিদপুরে পেঁয়াজের ফলন বেশী দাম কম, লোকসানে কৃষক
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের দক্ষিণ বঙ্গের পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর জেলা ফরিদপুর। বর্তমানে চলছে বিভিন্ন উপজেলার মাঠে মাঠে পেঁয়াজ তোলা প্রা য় শেষের দিকে খরচের তুলনায় পেঁয়াজের দাম কম থাকায় চাষীদের কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের পার্থক্য থাকায় হতাশ পেঁয়াজ চাষীরা। গত বছরের তুলনায় এ বছর পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে বাজারে পেঁয়াজের বাজার দাম কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষীদের। এ বছর ৭০০ টাকা থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত দেশি পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এ কারণে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ কমছে চাষীদের।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ ধরা হয়। তবে আবাদ হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছরের তুলনায় অনেক বেশী আবাদ হয়েছে।
ফরিদপুরের নগরকান্দা, সালথা, ভাঙ্গা, বোয়ালমারী মধুখালী, উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরা এবার বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ার আশায় যারা বুক বেঁধেছিলেন, রমজানের ঠিক আগে বাজারে দরপতনে তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৭০০ থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। নগরকান্দা উপজেলার তালমা বাজারের পেঁয়াজ হাটে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার সংখ্যা বেশি। নগদ টাকার জরুরি প্রয়োজন হওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়েই লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ মনে বাড়ি ফিরছেন।সালথা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সালথায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের দাবি, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি ও সেচ খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। ফলে বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি মণে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের নাড়ুয়াহাটি গ্রামের কৃষক আলেম সেক বলেন এ বছর পেঁয়াজের ফলন অনেক বেড়েছে কিন্তু দাম কম হাওয়ার কারনে আমাদের পূজি উঠে আসাই মুশকিল হয়েছে।
সালথার নকুলহাটি, ঠেনঠেনিয়া, কাগদি, মাঝারদিয়াসহ বিভিন্ন হাটে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এলেও দাম বাড়ছে না। কৃষকদের দাবি, ধান-গমের মতো পেঁয়াজেরও সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা এবং প্রতিটি ইউনিয়নে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোল্ডস্টোরেজ বা হিমাগার নির্মাণ করা প্রয়োজন।
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন সিকদার বলেন, বাজারে চাহিদা কম থাকায় দামও কম। অনেক কৃষক দেনা পরিশোধের চাপে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছেন। তবে সম্ভব হলে কৃষকদের পেঁয়াজ কিছুদিন সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছি। পরবর্তীতে চাহিদা বাড়লে তারা ভালো দাম পেতে পারেন।
এদিকে জেলার নগরকান্দা, সদর, ভাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায় একই চিত্র। জেলায় সর্বত্রই এখন ক্ষেত থেকে চাষীরা পেঁয়াজ উত্তোলনে কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলার অধিকাংশ উপজেলা বিস্তীর্ণ মাঠের দিকে তাকালেই এমন দৃশ্য চোখে মেলে। কেউ খেত থেকে মাটি খুঁড়ে পেঁয়াজ তুলছে, কেউ পাত্রে তুলে বস্তায় ভরছে, কেউবা মাঠ থেকে বস্তা মাথায় করে সড়কে তুলছে। পেঁয়াজ চাষীরা কেউ ভ্যান বা নছিমন যোগে বাজারে নিচ্ছে বিক্রির উদ্দেশে।
ফরিদপুরের বিভিন্ন পেঁয়াজ বাজারগুলোতে পাইকারি পেঁয়াজের দর রয়েছে ৭০০ থেকে ১১০০ টাকা পর্যন্ত মন। সেখানে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা চাষিরা বলছে এক মন পেঁয়াজ উৎপাদনের ব্যয় হাজার টাকা ছাড়িয়েছে।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, এটা ঠিক যে পেঁয়াজের দামে খুব একটা খুশি না চাষীরা। কারণ বাজারে পেঁয়াজের যোগান বেড়েছে অনেক, সেই তুলনায় ক্রেতাদের চাহিদা কম থাকায় দরটি পড়ে গেছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও চাষাবাদ হয়েছে বেশি। আমার পরামর্শ এই মুহূর্তে পেঁয়াজ বিক্রি না করে কয়েকটি মাস সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করলে কৃষকরা ভালো দর পাবেন বলে আশা করছি