২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় পশ্চিম জগৎচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হন তিনি। সেদিন আর ভোট দিতে পারেননি। ভারাক্রান্ত মনে প্রতিজ্ঞা করেন—যত দিন না বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে, তত দিন তিনি ভাত খাবেন না। পরবর্তীতে পরিবার ও স্বজনরা নানাভাবে চেষ্টা করেও তার অনড় অবস্থানের কারণে তাকে ভাত খাওয়াতে পারেননি।ভোটাধিকার হরণের এমন অভিনব প্রতীকী প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন কিশোরগঞ্জের বিএনপিভক্ত ইনু মিয়া।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার জগৎচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত সুলায়মান মিয়ার ছেলে ইনু মিয়া। প্রতিজ্ঞার পর থেকে একে একে কেটে গেছে প্রায় দেড় যুগ। বিএনপিপাগল ৮০ বছরের বৃদ্ধ ইনু মিয়া ভাত খাওয়া যেন ভুলেই গিয়েছিলেন।
ইনু মিয়া কৃষিশ্রমিক হিসেবে মানুষের জমিতে কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাঁ পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে লাঠি ভর করে খুঁড়িয়ে চলেন। ফলে এখন আর কাজ করতে পারেন না। শুয়ে-বসে ও ভিক্ষাবৃত্তি করেই দিন কাটছে তার।
ইনু মিয়ার স্ত্রীর নাম জোছনা খাতুন। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। ছোট ছেলে জাকির হোসেন জুতার দোকানে কাজ করেন। আর মেয়ে মার্জিয়া খাতুনের বিয়ে দিয়েছেন।
বিএনপিভক্ত ইনু মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছোটবেলায় ভৈরবে এক জনসভায় মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে প্রথম দেখি। তার বক্তব্য শুনে আকৃষ্ট হয়ে তখন থেকেই তার প্রতি ভালোবাসা জন্মে এবং বিএনপির প্রতি অনুরাগ তৈরি হয়। সেই থেকে বিএনপি আমার মনেপ্রাণে মিশে রয়েছে। বিগত ১৭ বছর ধরে ভোট দিতে পারিনি। দুঃখে-কষ্টে ভাত খাইনি।’
ইনু মিয়া বলেন, ‘বিএনপি এখন ক্ষমতায় এসেছে, আমাদের নেতা শরীফুল আলম এমপি থেকে মন্ত্রী হয়েছেন। তাই অতীতের কষ্ট মাটিচাপা দিয়ে মুখে ভাত তুলেছি। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদেই এত দিন আমার এই প্রতিজ্ঞা ছিল।’
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, বিএনপি ক্ষমতায় না এলে ইনু মিয়া ভাত খাবেন না—এমন বিষয়টি
এলাকার সবার জানা ছিল। আমরা চেষ্টা করেও তাকে খাওয়াতে পারিনি। বিএনপি নেতা শরীফুল আলম তাকে কথা দিয়েছিলেন—দল ক্ষমতায় এলে নিজের হাতে ইনু মিয়াকে ভাত খাওয়াবেন। অবশেষে তিনি ভাত মুখে নেওয়ায় আমরা আনন্দিত।
ইনু মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন বলেন, ‘বিগত সময়ে বিএনপি সমর্থন করার কারণে আমার বাবা ও আমরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছি। অনেক রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারিনি। আমি বছরে তিন মাস জুতার কাজ করি, বাকি ৯ মাস বেকার থাকি।’
ইনু মিয়ার স্ত্রী জোছনা আক্তার বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেছি ভাত খাওয়ানোর জন্য, কিন্তু পারিনি। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে নিয়েও ভাত খাওয়াতে পারিনি। তার একটাই কথা ছিল—যত দিন না বিএনপি ক্ষমতায় আসবে, তত দিন ভাত খাবেন না। রুটি, পুরি, বিস্কুট
আসবে, তত দিন ভাত খাবেন না। রুটি, পুরি, বিস্কুট ও চা খেয়ে এত দিন বেঁচে ছিলেন। এর মধ্যে কয়েকবার অসুস্থও হয়েছেন।’
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, ‘যে ব্যক্তি দলকে ভালোবেসে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তার পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব। ভাত না খেয়ে বয়োবৃদ্ধ ইনু মিয়া প্রতীকী প্রতিবাদ করে গেছেন। আমরা দলীয় নেতাকর্মীরা তার যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকব, ইনশাআল্লাহ।’
অচিরেই ইনু মিয়াকে একটি নতুন ঘর করে দেবেন এবং একটি বয়স্ক ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম।