|
Getting your Trinity Audio player ready...
|

রংপুর জেলায় মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে পুকুর, নদী ও জলাবদ্ধ এলাকায় পানিতে ডুবে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮ জন শিশু, ৪ জন কিশোর এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রয়েছেন।
একের পর এক এমন মর্মান্তিক ঘটনায় জেলাজুড়ে শোক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে পীরগাছা উপজেলায়। এ ছাড়া তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ ও রংপুর মহানগরীতেও পৃথক ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বদরগঞ্জে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধার
রোববার (৭ জুন) দুপুরে বদরগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বুজরুক বাগবাড়ি গ্রামে নিখোঁজের তিন দিন পর সাজেদুল ইসলাম (১৪) নামে এক কিশোরের মরদেহ পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিন দিন আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে আর ফিরে আসেনি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও তার সন্ধান মেলেনি। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস পুকুর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে এটি পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।পীরগাছায় তিন দিনে ছয় শিশুর মৃত্যু
পীরগাছা উপজেলায় কয়েক দিনের ব্যবধানে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (৬ জুন) কল্যাণী ইউনিয়নের চওড়া মাসুয়া পাড়ায় পাঁচ বছরের এক শিশু পুকুরে পড়ে মারা যায়।
এর আগের দিন শুক্রবার (৫ জুন) কৈকুড়ী ইউনিয়নের নজর মাহমুদ এলাকায় রাজীব মিয়া (৬) ও সেনাতুল আক্তার (৪) পানিতে ডুবে মারা যায়।
তারা চাচাতো ও জ্যাঠাতো ভাই-বোন।
৩ জুন কান্দি ইউনিয়নের দিকটারী ও দাদন দোলাপাড়া এলাকায় সোহাগ (৪) ও আবিদ হাসান (৭) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। তারা সম্পর্কে ফুপাতো-মামাতো ভাই।
একই দিনে ১৪ মাস বয়সী ওয়াজেদ আলী নামে আরেক শিশু বাড়ির পাশের জলাবদ্ধ জমিতে পড়ে মারা যায়। পরিবারের অজান্তে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল বলে জানা গেছে।গঙ্গাচড়ায় ভাই-বোনের মৃত্যু
গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের মাজারেরপাড় এলাকায় ২৭ মে পানিতে ডুবে রুশা মনি (১৫) ও তার ছোট ভাই সাইফ (৫) মারা যায়। একই পরিবারের দুই সন্তানের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
তারাগঞ্জে নদীতে গোসলে নেমে দুই কিশোরের মৃত্যু
২৯ মে তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের ডাঙ্গীরহাট তেলিপাড়া গ্রামে যমুনেশ্বরী নদীতে গোসল করতে নেমে অহিদ ইসলাম (১৫) ও মাসুদ রানা (১৬) নামে দুই কিশোরের মৃত্যু হয়।
স্থানীয়রা জানান, তারা বন্ধু ছিল এবং একসঙ্গে গোসল করতে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যায়।
ঘাঘট নদীতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু
গত ৫ জুন রংপুর মহানগরীর পানবাড়ি এলাকায় ঘাঘট নদীতে গোসল করতে নেমে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিহাব (২৬) পানিতে ডুবে মারা যান। তিনি নগরীর দর্শনা সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও স্থানীয় এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ এলাকায় পুকুর, ডোবা, খাল ও নদীতে সহজ প্রবেশাধিকার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
তাদের মতে, শিশুদের একা পানির কাছে যেতে না দেওয়া, বাড়ির আশপাশের জলাশয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. গওসুল আজিম চৌধুরী বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্রামাঞ্চলের খোলা জলাশয়ের আশপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।’
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, ‘সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, অধিকাংশ পুকুর ও জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় শিশুরা সহজেই ঝুঁকিতে পড়ে। তারা পুকুরে বেড়া, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ১২ জনের মৃত্যু রংপুরের জন্য একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
















আপনার মতামত লিখুন :