ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার পোড়াকান্দুলিয়া ইউপি ভবনে গত রবিবার দুপুর পৌনে ১টায় সব কক্ষে তালা মারা দেখা যায়। ছবি: কালের কণ্ঠ
৭০ বছর বয়সী শামসুল হকের দরকার তার নাতির জন্ম নিবন্ধন। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পারছেন না কোন দিকে যাবেন।
কারণ ভবনের সব কক্ষে তালা। এমনকি দোতলায় যাওয়ার কলাপসিবল গেটেও তালা দেওয়া।
শামসুল হক খুব অসহায় বোধ করতে করতে ওই পথ দিয়ে যাওয়া দুই স্কুলছাত্রকে জিজ্ঞেস করেন, ‘অফিস সব বন্ধ কেরে’।
গত রবিবার (৯ আগস্ট) দুপুর পৌনে ১টার দিকে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার পোড়াকান্দুলিয়া ইউপি ভবনের সামনের ঘটনা এটি।
বৃদ্ধ শামসুল হকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার বাড়ি একই ইউনিয়নের আঙ্গরকান্দা গ্রামে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবারও ইউপি কার্যালয়টি বন্ধ পান শামসুল। তার বাড়ি কার্যালয় থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তিনি দুই দিন গিয়েও কাউকে না পেয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন তিনি।
ইউপি কার্যালয়টি অবস্থিত ধোবাউড়া উপজেলার পোড়াকান্দুলিয়া বাজারে। কার্যালয়ের বাইরে থাকা একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে ইউপি কার্যালয়ের বেসরকারি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করা মোসলেম নামের একজন কার্যালয়ে গিয়ে পতাকা টানান। এর পরই তিনি বের হয়ে যান। সারা দিন আর কেউ যান না সেখানে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পোড়াকান্দুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর হকের বাড়ি পোড়াকান্দুলিয়া বাজার থেকে চার কিলোমিটার দূরে দুধনই বাজারের কাছে।
দুধনই বাজারে চেয়ারম্যানের রয়েছে ব্যক্তিগত চেম্বার। প্রতিদিন ওই চেম্বারেই বসেন তিনি। এ কারণে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বেসরকারি উদ্যোক্তা ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরাও চেয়ারম্যানের চেম্বারে বসেন।
সেবা পেতে ইউপি কার্যালয়ে যাওয়া মানুষ কার্যালয়ে যাওয়ার পর জানতে পারেন, চেয়ারম্যানসহ সবাই দুধনই বাজারে রয়েছেন। তখন আবারও সেখানে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজন সারেন সেবাপ্রত্যাশীরা। দীর্ঘদিন ধরেই এভাবে চলতে চলতে অনেকে জেনে গেছে, ইউপি কার্যালয়ে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই এখন কার্যালয়ে না গিয়ে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত চেম্বারে যান।
পোড়াকান্দুলিয়া বাজারের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, শুধু ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক সেবাই নয়, টিসিবির পণ্য নিতেও আমাদের এলাকার মানুষকে যেতে হয় দুধনই বাজারে। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়তি টাকাও খরচ হয়।
স্থানীয়রা আরো জানান, চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল হক কয়েক দফায় অন্তত ১৫ বছর ধরে পোড়াকান্দুলিয়ার চেয়ারম্যান। তবে মাঝখানে একবার নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। তখন সরকারিভাবে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়টি নির্মাণ করা হয়।
মঞ্জুরুল ওই সময় চেয়ারম্যান না থাকলেও তিনি চেয়েছিলেন, কার্যালয়টি তার বাড়ির পাশে দুধনই বাজারে হোক। কিন্তু সেটি না হওয়ায় মনে মনে ক্ষিপ্ত হন তিনি। এ কারণে পরবর্তীতে তিনি আবারও চেয়ারম্যান হওয়ার পর কার্যালয়ে না গিয়ে নিজের বাড়ির পাশেই বসেন।
ইউপি কার্যালয় রেখে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে বসেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে পোড়াকান্দুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জলিল আকন্দ বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে যেখানে বসে কাজ করতে বলবেন, আমি সেখানেই বসতে বাধ্য। কাজেই এ প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই।‘
রবিবার (১০ আগস্ট) দুধনই বাজারে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়ে জানা যায়, তিনি কিছুক্ষণ আগে বের হয়ে গেছেন। পরে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সপ্তাহের কয়েকদিন ইউপি কার্যালয়ে বসি। বাকি কয়েকদিন ব্যক্তিগত চেম্বারে বসি।’ জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।’