সরকার তামাক খাত থেকে যত রাজস্ব পায় তার দ্বিগুণের বেশি অর্থ তামাকজনিত নানান রোগের চিকিৎসা ব্যয় হয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা আরো জানান, তামাকের কারণে মৃত্যু ও অকাল পঙ্গুত্ব এবং পরিবেশের ক্ষতির কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়। তাই শুধু রাজস্ব আয়ের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তামাক কোম্পানিগুলোকে বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়ার অর্থ হবে আরো বেশি মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের সঙ্গে আপোষ করা। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক কোম্পানির সাথে আপোষ নয়’ এ নীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সারাদেশের শতাধিক তামাক বিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মশালার সমাপনী অধিবেশনে এই আহ্বান জানানো হয়।
সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০২৫ সালে পাস হওয়া অধ্যাদেশে উল্লিখিত ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টসসহ ইমার্জিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধের বিধান ২০২৬ সালে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপেক্ষা করা হযেছে। ফলে নতুন প্রজন্মকে এই পণ্যের ভোক্তা বানানো সহজ হবে।
আইনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলো নতুন প্রজন্মকে লক্ষ্য করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের বাজার সম্প্রসারণ করবে, যা শিশু-কিশোর ও তরুণদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলবে। তাই দ্রুত ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধ করা জরুরি।
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা) ও ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট আয়োজিত কর্মশালায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, আইন বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, তামাক কর এবং তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ বিষয়ে ২৫ জন বিশেষজ্ঞ ও অতিথি আলোচক বক্তব্য দেন। পাশাপাশি ১০টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।উদ্বোধনী ও সমাপনী আয়োজন ছাড়াও একটি প্ল্যানারি সেশন এবং তিনটি প্যারালাল সেশনের মাধ্যমে কর্মশালাটি পরিচালিত হয়। প্রতিটি সেশনে অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলো বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ ওয়ার্কে অংশ নেয়।
বাটার সমন্বয়কারী সাইফুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ও ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের বিভাগীয় প্রধান সৈয়দা অনন্যা রহমানের সঞ্চালনায় সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব সৈয়দ মো. হামিদুর রহমান খান, ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের জ্যেষ্ঠ কারিগরি পরামর্শক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম প্রমূখ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মো. আখতার-উজ-জামান, প্রত্যাশা মাদকবিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ, ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের হেড অব প্রোগ্রাম মো. শফিকুল ইসলাম, সেতু’র প্রকল্প পরিচালক (তামাক নিয়ন্ত্রণ) শাগুফতা সুলতানা প্রমূখ।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ কেবল স্বাস্থ্য ক্ষতি নয় বরং অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশের সাথেও সম্পৃক্ত।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাথে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে সম্পৃক্ত করেছে। কোন চাষি যাতে তামাক চাষে প্রলুব্ধ না হয় সে বিষয়ে চাষিদের সচেতন করতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত করা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, আইন প্রণয়নকারী সংস্থা, গণমাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানান তিনি।
যুগ্ম সচিব মো. আখতার-উজ-জামান বলেন, ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাগুলো সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত হয়। তামাক নিয়ন্ত্রণ আন্দোলনে অনেক অর্জন রয়েছে। পাবলিক প্লেসে সিগারেটসহ সকল তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা করা হয়েছে। এ আইন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। টাস্কফোর্স কমিটিগুলো সক্রিয় করার আহ্বান জানান তিনি।
সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস ইত্যাদি পণ্য নিষিদ্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
স্থানীয় বেসরকারি সংগঠনগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল-কে অনুরোধ জানান সাইফুদ্দিন আহমেদ। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, স্কুল কলেজের আশেপাশে ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক পণ্য নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান বাস্তবায়নে টাস্কফোর্স উদ্যোগ নিবে এবং বাস্তবায়ন করবে।