ব্যবসায়িক লেনদেনে অনুসন্ধানের মুখে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্বপ্রাপ্ত বিলিয়নেয়ার মুহাম্মদ আজিজ খানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এই ব্যবসায়ী, তার পরিবারের সদস্য এবং সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ছাড়াও মানিলন্ডারিং বা অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশে তাদের জমি ক্রোক করা হয়েছে। তবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইটস টাইমস-এর কাছে এই ব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আজিজ খান নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), যৌথ মূলধন কম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) এবং আয়কর কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা বাংলাদেশ সরকারের যেকোনো তদন্তে সহযোগিতা করছে, যেমনটি আমাদের করার কথা। আমরা এই তদন্তকে পূর্ণ সমর্থন জানাই কারণ আমরা জানি যে আমরা নির্দোষ প্রমাণিত হব।’
তিনি আরো জানান, এখন পর্যন্ত তার বা তার কম্পানির বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন করা হয়নি এবং বাংলাদেশে কোনো মামলাও নেই। উল্লেখ্য, আজিজ খানের ভাই, যিনি বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী ছিলেন, ২০২৪ সালে একজন রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে রয়েছেন।
ফোর্বসের তালিকায় সামিট গ্রুপ:
২০২৫ সালের ফোর্বস তালিকা অনুযায়ী, আজিজ খান সিঙ্গাপুরের ৪৯তম শীর্ষ ধনী, যার মোট সম্পদের পরিমাণ ১১০ কোটি মার্কিন ডলার। ৭০ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, বন্দর, ফাইবার অপটিকস এবং রিয়েল এস্টেট খাতে তার বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তার প্রধান কম্পানি ‘সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ সিঙ্গাপুরভিত্তিক এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ অবকাঠামো উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
২০১৯ সালে জাপানের জ্বালানি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান জেরা কোং (JERA Co) ৩৩ কোটি মার্কিন ডলারে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ২২ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়, যার ফলে কম্পানিটির তৎকালীন বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারে।
সিঙ্গাপুরের আরো ১০টি সক্রিয় কম্পানিতে পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত থাকা মিস্টার খান ১৯৭০-এর দশকে ১৮ বছর বয়সে এমবিএ (MBA) ডিগ্রিধারী হিসেবে প্রথম দেশটিতে আসেন। শুরুতে তিনি থার্মোপ্লাস্টিক ও অন্যান্য পণ্য কেনাবেচার একটি কোম্পানিতে কাজ করেন। পরবর্তীতে নিজেই একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ধীরে ধীরে সার ও চিটাগুড় রপ্তানির মাধ্যমে ব্যবসার প্রসার ঘটান। সবশেষে তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে মনোনিবেশ করেন।
মিস্টার খান ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (IPP) স্থাপন করেন। বর্তমানে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে।
আজিজ খান ১৯৮৮ সালে সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। তিনি ইউনিসেফ ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের সদস্য এবং ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিনল্যান্ডের অনারারি কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তদন্ত
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আজিজ খানের ব্যবসায়িক সংকট শুরু হয়। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে তার অনুপস্থিতিতেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিজয়ী হওয়ায় তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। কর্তৃপক্ষের তদন্তের মুখে থাকা একমাত্র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুর প্রবাসী ব্যক্তি মিস্টার খানই নন।
দ্বিতীয় বিলিয়নেয়ার
বিলিয়নেয়ার সাইফুল আলম মাসুদ এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধেও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। মিস্টার আলম এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান; এই গ্রুপটি খাদ্য, উৎপাদন, জ্বালানি, পরিবহন, আবাসন ও টেলিযোগাযোগের মতো বৈচিত্র্যময় খাতের সাথে জড়িত। এই ব্যবসায়ী অথবা তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বেশ কিছু হোটেল এবং বাণিজ্যিক সম্পত্তি রয়েছে।
মিস্টার আলম, তার পরিবারের সদস্য এবং সহযোগীদের—বিশেষ করে যারা এস আলম গ্রুপের সাথে যুক্ত—তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধের মামলা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার আদালত সাবেক হাসিনা প্রশাসনের একটি আদেশ স্থগিত করেছে, যার মাধ্যমে মিস্টার আলমকে স্বেচ্ছায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) মিস্টার আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির অনুরোধ করার নির্দেশ দিয়েছে। এর বিপরীতে, ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস’-এ আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা দায়ের করেছেন তার মার্কিন আইনজীবীরা (কুইন ইমানুয়েল উরকুহার্ট অ্যান্ড সালিভান)। তাদের দাবি, তাদের মক্কেল ‘অযৌক্তিক সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত এবং সম্পদ ধ্বংসের একটি পরিকল্পিত প্রচারণার’ শিকার।
সিঙ্গাপুরের আইনি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ংপার্টনারশিপ’-এর পক্ষ থেকে মিস্টার আলমের আইনজীবীরা ‘দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’ (ST)-কে বলেছেন যে, ‘বেআইনি, স্বেচ্ছাচারী এবং বৈষম্যমূলক’ পদক্ষেপের ফলে তাদের মক্কেল ‘গুরুতর অর্থনৈতিক’ এবং ‘তীব্র সুনামহানির’ শিকার হয়েছেন এবং তারা ‘উপযুক্ত সময়ে’ এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করবেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসিনা প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অর্থপাচার প্রতিরোধ ও পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি প্রকাশ করেছে যে, তারা সামিট ও এস আলম গ্রুপসহ ১০টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং হাসিনা পরিবারের সদস্যদের ৬৬,১৪৬ কোটি টাকা (৬৮৩ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার) মূল্যের সম্পদ জব্দ করেছে।
এর ১২ মাস আগে ড. ইউনূসের নির্দেশে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে দেশ থেকে পাচার হয়ে থাকতে পারে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শ্বেতপত্রে চিহ্নিত হওয়ার পর ইউনূস প্রশাসন মিস্টার খানের সামিট গ্রুপের সঙ্গে একটি এলএনজি প্রকল্প বাতিল করে।
একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সামিট গ্রুপ বলেছে, ‘সামিট গ্রুপ সর্বদা বাংলাদেশ এবং সিঙ্গাপুর—উভয় দেশের আইন মেনে চলেছে।’ শ্বেতপত্রে সামিট গ্রুপকে এমন একটি ‘নির্বাচিত বড় গোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা প্রকল্পের আয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে আয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ কর অব্যাহতি সুবিধা ভোগ করেছে। সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল এই দাবি খণ্ডন করে বলেছে, ‘এই অব্যাহতিগুলো কেবল সামিট গ্রুপের জন্য ছিল না, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পুরো খাতের একটি কৌশলের অংশ ছিল।’
২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশের আদালত মিস্টার খান ও তার পরিবারের সদস্যদের আরও নগদ অর্থ ও সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে লুক্সেমবার্গে মিস্টার খান ও তার পরিবারের ৪১ লক্ষ ইউরো মূল্যের শেয়ার এবং বাংলাদেশে অন্তত ৪১.৭৪ কোটি টাকা ও ৩৮,৮০০ বর্গফুট জমি রয়েছে।
মিস্টার খান অবশ্য দাবি করেছেন যে, চলমান তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের ফলে তার ব্যবসায় কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং ‘প্রতিটি ব্যবসা আগের চেয়ে ভালো করছে’। তবে এগুলো তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, “সারা বিশ্বে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার থাকলেও বাংলাদেশে বাড়তি বিদ্যুৎ রয়েছে। আমরা ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ডাটা সেন্টার তৈরি করতে চাই। আমরা সেটি করতে পারছি না। আমার মতে, এটিই আমাদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশে ‘উপাত্ত দারিদ্র্য’ (Data Poverty) দূর করার পথে বাধা… অতীতে আমরা দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা দূর করেছি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রক্রিয়াটিকে দীর্ঘায়িত করছে।”
মিস্টার খান জানিয়েছেন, বাংলাদেশে তার আইনি জটিলতা নিয়ে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তার সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি। মিস্টার খান ও মিস্টার আলমের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ‘দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’ (ST) বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাথে যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া পায়নি।
পত্রিকাটি সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছেও এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে জানতে চেয়েছিল এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আইনি সহায়তার অনুরোধ পাওয়া গেছে কি না, তা জিজ্ঞাসা করেছিল। জবাবে মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালে দেওয়া তাদের আগের বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। তখন তারা বলেছিল: ‘ক্রিমিনাল ম্যাটারস অ্যাক্টে পারস্পরিক সহায়তার অধীনে সিঙ্গাপুর বিদেশি বিচার বিভাগকে পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রদান করতে পারে। এর মধ্যে সম্পদের স্থানান্তর সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান এবং বিদেশি বাজেয়াপ্তকরণ আদেশ কার্যকর করা অন্তর্ভুক্ত।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ সম্পদ ভাগাভাগি এবং সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে মামলাভেদে বিদেশি কর্তৃপক্ষের সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করে থাকে।’