তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেওয়ার হার গত বছরের তুলনায় বেড়ে ৮৮ শতাংশে পৌঁছালেও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে তা বহাল রাখছে মাত্র ৩৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া ৭৩ শতাংশ মোড়কের উভয় পাশে সংবিধিবদ্ধ এই সতর্কবাণী পাওয়া যায়নি।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেলের (টিসিআরসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তামাক পণ্যের মোড়কে সচিত্র সতর্কবাণী ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক তথ্য প্রদর্শনে এমন ব্যাপক আইন লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে।
আজ রবিবার (৯ আগস্ট) রাজধানীর একটি সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট ও টিসিআরসি যৌথভাবে ‘আইন অনুযায়ী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়ন : বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার এই ফল প্রকাশ করে।
উন্নয়ন সংস্থা ‘সেতু’র প্রকল্প পরিচালক শাগুফতা সুলতানার সভাপতিত্বে ও টিসিআরসির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের নেটওয়ার্ক অফিসার আজিম খান প্রমূখ। এ ছাড়া গবেষণা তথ্য উপস্থাপন করেন টিসিআরসির প্রকল্প কর্মকর্তা বিভূতী ভূষণ মাহাতো।
তিনি বলেন, ৮৮ শতাংশ মোড়কে সতর্কবাণী থাকলেও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে তা রয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ মোড়কে।
এ ছাড়া ২৯৭টি জর্দার মোড়কের মধ্যে মাত্র ২৮ শতাংশে এবং ২০টি গুলের মোড়কের কোনোটিতেই নির্ধারিত ৫০ শতাংশ জায়গায় সতর্কবাণী ছিল না বলে জানান তিনি।
গবেষণা চালানো ৩৯৪টি পণ্যের মোড়কের মাত্র ১৬ শতাংশে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (এমআরপি) এবং ৫৫ শতাংশে উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ ছিল। এ ছাড়া ৮০ শতাংশ মোড়কেই কোনো ট্রেড লাইসেন্স নম্বর পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া তামাকের ব্র্যান্ড নাম বা স্ট্যাম্প দিয়ে সতর্কবাণী আংশিক ঢেকে রাখা, খোলা তামাক ও খুচরা শলাকা বিক্রি এবং নিম্নমানের মোড়ক ব্যবহারের মতো অভিযোগও সামনে এসেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে গবেষণালব্ধ তথ্য নীতি নির্ধারণ ও আইন বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখে। এই জাতীয় ধারাবাহিক গবেষণার ফলেই তামাক কম্পানির বেআইনি বিএসটিআই লোগো ব্যবহার বন্ধ সম্ভব হয়েছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল ও ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী যৌথভাবে বলেন, জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াশূন্য তামাক পণ্যের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের হার সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তারা।
গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ১০ বাস্তবায়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়—
১. সংশোধিত আইনের বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে মোড়কের ৭৫ শতাংশ জায়গাজুড়ে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ও স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
২. খুচরা শলাকা, খোলা তামাক এবং পানের সঙ্গে জর্দা বিক্রি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
৩. তামাক কম্পানিগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অধীনে নিবন্ধনের আওতায় আনা।
৪. নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং আইন লঙ্ঘনকারী তামাকপণ্য বাজেয়াপ্ত করে ধ্বংস করা।
এ ছাড়া সব তামাক কম্পানিকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অধীনে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, উৎপাদনের তারিখ, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্যসহ সব বাধ্যতামূলক তথ্য সঠিকভাবে মুদ্রণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।