মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। শুক্রবার তীব্র গরম ও পুলিশের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে দলটির ডাকে সেখানে জড়ো হন তরুণসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল জ্ঞানেশ কুমারকে লক্ষ্য করে লেখা ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার, মিম ও সিনেমার সংলাপের প্ল্যাকার্ড। যেমন, ‘জ্ঞানু, তুঝা ডেমোক্রেসি ভর ভরসা নায় কায়?’ বাংলা অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘জ্ঞানু, তোমার কি গণতন্ত্রের ওপর ভরসা নেই?’ এটি মূলত ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতের একটি জনপ্রিয় মারাঠি পলিটিক্যাল-ড্রামা ওয়েব সিরিজ ‘রানা বাজার’-এর একটি সংলাপ।
সিরিজটিতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং এক্স-এ এই ডায়ালগটি মিম হিসেবে প্রচুর ব্যবহৃত হয়।
যখন কেউ কোনো প্রচলিত নিয়ম, সমাজ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা কোনো বিষয়ের ওপর ক্ষোভ বা অবিশ্বাস প্রকাশ করে, তখন তাকে উপহাস বা ট্রোল করতে অন্যেরা মজার ছলে এই মিমটি ব্যবহার করে।
এ ছাড়া ‘জ্ঞানেশ ব্রো, জাস্ট রিজাইন’ এবং ‘গদ্দার জ্ঞানু মাস্ট গো’—এমন নানা স্লোগান লেখা পোস্টার দেখা যায়। এ সময় স্টুডেন্ট ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই)-সহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীদেরও তেরঙ্গা পতাকা হাতে বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়।
তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে পৌঁছেছেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি সেখানে বিক্ষোভ করছে। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ পার্কের ৬ নম্বর গেটের কাছে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এতে অভিনেত্রী শাবানা আজমি ও সংগীতশিল্পী বিশাল দাদলানিসহ আরো কয়েকজন তারকা যোগ দিতে পারেন বলে জানা গেছে। সিজেপি এর আগে নাগরিকদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
দলটি জানিয়েছে, অক্টোবরজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও জনসমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানান, এই কর্মসূচির শেষ হবে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে একটি বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি কেন?
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিতর্কের জেরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসআইআর-এর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি তুলেছিলেন।
তেলাপোকা জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের পর ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, ভোটার তালিকায় এত বড় পরিবর্তন নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এনডিএ ও বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ভোটের ব্যবধানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে নির্বাচন কমিশন। শনিবার কমিশন জানায়, এসআইআরসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন কমিশন সর্বসম্মতভাবে নিয়েছে। ফলে এসআইআর নিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে মতবিরোধ ছিল—এমন অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
‘জ্ঞানেশ কুমার একজন বিশ্বাসঘাতক’, দাবি সিজেপি নেতার
মুম্বাই প্রেস ক্লাবে এক আলাপচারিতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন তেলাপোকা জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত সিজেপি দেশজুড়ে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবে। দীপকে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত সিজেপি আন্দোলন চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনারও দাবি জানান তিনি।
মুম্বাই পুলিশের বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন দীপকে। তার প্রশ্ন, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ যদি শিবাজি পার্কে রাজনৈতিক সমাবেশ করতে পারেন, তাহলে সিজেপিকে সেখানে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে না কেন। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের কারণে গ্রেপ্তার হলেও তিনি ভয় পান না এবং আবারও প্রতিবাদে ফিরবেন।
এদিকে সিজেপি নেতা অজিঙ্ক্যা শিন্ডে জানান, আন্দোলন মুম্বাইয়ের বাইরে বিভিন্ন শহরেও ছড়িয়ে দেওয়া হবে। দিল্লি গোয়া, বেঙ্গালুরু, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, পাটনা ও রাঁচিতে বিক্ষোভের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে অক্টোবরের শেষ দিকে দিল্লির যন্তর মন্তরেও বিক্ষোভ করার কথা জানিয়েছে দলটি। সিজেপি আরো জানিয়েছে, তারা নিজেদের কর্মসূচি স্বাধীনভাবে চালাবে এবং ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর নির্ধারিত বিক্ষোভে অংশ নেবে না।
শিবাজি পার্কে প্রস্তাবিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দাদর স্টেশনে নিরাপত্তা জোরদার করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। স্টেশনটিতে রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরপিএফ) সদস্যসহ অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। সেন্ট্রাল রেলওয়ের এক মুখপাত্র জানান, প্রায় ৪০ জন অতিরিক্ত কর্মী স্টেশনে মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আরো ৫০ জন কর্মী ও আরপিএফ সদস্যকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।দাদর মুম্বাইয়ের অন্যতম ব্যস্ত রেলস্টেশন এবং এটি শিবাজি পার্কের সবচেয়ে কাছের প্রধান স্টেশন। বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসতে পারেন, এমন আশঙ্কায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এদিকে শিবাজি পার্কে জনসমাগমের ওপর বিধিনিষেধ, প্রয়োজনীয় পৌর অনুমতির অভাব এবং যান চলাচল ও জরুরি পরিষেবার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উল্লেখ করে প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি মুম্বাই পুলিশ।ইসিআই-এর ‘ভিন্নমত’ নিয়ে বিতর্ক
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনার মধ্যেই কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি সিদ্ধান্ত ও আদেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাঁদের অজান্তেই জারি করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন এসব দাবি নাকচ করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন এসআইআরসহ সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে নিয়েছে। ফলে কমিশনের ভেতরে কথিত মতপার্থক্য নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।