ভোরে মেঘনা নদীতে যান মাছ ধরতে। কখনো কাটে সারারাত, কখনো দিনভর।
মাছ বিক্রি করে প্রতিদিনের দুই-তিন হাজার টাকা থেকে একটু একটু করে সঞ্চয় করতেন জেলে মোক্তার উদ্দিন (৫০)। স্বপ্ন ছিল ছোট ছেলে সাইফুল ইসলামকে মালয়েশিয়ায় পাঠাবেন। সেই স্বপ্ন পূরণে পাঁচ-ছয় বছর ধরে জমিয়েছিলেন টাকা। কিন্তু এক আগুনেই মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তাঁর প্রায় ২২ লাখ টাকার সঞ্চয়।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে মোক্তার উদ্দিনের বসতঘরে আগুন লাগে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের ঘরগুলোতে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে মোক্তারের ঘরের চালের ড্রামে লুকিয়ে রাখা জীবনের সব সঞ্চয় পুড়ে যায়।
আগুনে তাঁর পাঁচটি বসতঘরও পুড়ে গেছে। ঘরের আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে পুড়ে যাওয়া চালের ড্রাম থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা অর্ধপোড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে বাকি টাকা পুরোপুরি পুড়ে গেছে।
মোক্তার উদ্দিন ছোটবেলা থেকেই মেঘনা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
নদীই তাঁর কর্মস্থল, নদী থেকেই সংসারের আয়। প্রতিদিন দুই-তিন হাজার টাকার মাছ বিক্রি করে যে টাকা পেতেন, সেখান থেকে সংসারের খরচ বাদ দিয়ে সামান্য সামান্য করে জমাতেন। বড় ছেলে খাইরুলকে আট বছর আগে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। এবার ছোট ছেলে সাইফুলকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর স্বপ্ন দেখছিলেন।
সেই স্বপ্নের জন্যই এতদিনের সঞ্চয়। চলতি মাসে ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। এর মধ্যে পাশের গ্রামের একটি এনজিও থেকে কিস্তিতে আরো চার লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। বড় ছেলে খাইরুলও প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে বাড়িতে পাঠাতেন। সব মিলিয়ে প্রায় ২২ লাখ টাকা জমেছিল তাঁর কাছে।
কিন্তু ব্যাংকে টাকা রাখার অভ্যাস ছিল না মোক্তারের। সহজ-সরল এই জেলে উপজেলা সদরে খুব একটা যেতেন না। ব্যাংক হিসাব খোলাকেও ঝামেলা মনে করতেন। তাই বছরের পর বছর কষ্ট করে জমানো টাকা ঘরের চালের ড্রামেই লুকিয়ে রেখেছিলেন।
মোক্তার উদ্দিন বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করে হাজার টাকা থেকে লক্ষ টাকার বান্ডিল বানিয়ে চালের ড্রামে রাখতাম। ভোরে নদীতে গিয়ে রাতে বাড়ি ফিরতাম। আবার কোনো দিন সন্ধ্যায় নদীতে গিয়ে সকালে বাড়ি ফিরতাম। এভাবে প্রতিদিন দুই-তিন হাজার টাকার মাছ বিক্রি করে আয় হতো। কষ্টের এই টাকা নষ্ট হওয়ায় আমি দিশেহারা। কীভাবে আমার ছেলেকে মালয়েশিয়া পাঠাব, এখন বুঝতেছি না।’
গ্রামের বাসিন্দা ফজলু রহমান বলেন, মোক্তার উদ্দিন সহজ-সরল মানুষ। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজে তাঁর তেমন মনোযোগ নেই। কয়েক মাসে একবারও উপজেলা সদরে যান না। তাঁর কোনো ব্যাংক হিসাবও নেই। তাই কষ্টের উপার্জনের টাকা ঘরেই জমিয়ে রেখেছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, শ্যামপুর মধ্যপাড়া এলাকায় রিয়াজ মিয়ার ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তীব্র আগুন দ্রুত এক ঘর থেকে পাশের ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে উপজেলা সদর থেকে গ্রামটি বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের সেবা পাওয়া যায়নি বলে তাঁরা জানান।
এ বিষয়ে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.কে.এম মামুনুর রশিদ বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তারা মোটামুটি অস্বচ্ছল। বৃহস্পতিবার ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্ধপোড়া অবস্থায় পাওয়া ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার বিষয়ে ইউএনও বলেন, টাকা যাচাই-বাছাই করে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেওয়ার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।
তবে সব হারিয়েও মোক্তার উদ্দিনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াবেন তিনি, আর কীভাবে পূরণ করবেন ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর সেই স্বপ্ন? মেঘনা নদীর ওপর ভর করে বছরের পর বছর যে স্বপ্ন তিনি একটু একটু করে গড়েছিলেন, এক আগুনে সেই স্বপ্ন এখন প্রায় ছাই হয়ে গেছে।