শোলাকিয়ায় এবার ঈদের জামাত হবে ১৯৯তম। নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে জামাতের জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি চলছে কিশোরগঞ্জের এই ঈদগাহে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় অনুষ্ঠেয় জামাতে ইমামতি করবেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে পরপর তিনবার বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হবে।
আজ মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, মাঠে দাগকাটা, বালু ফেলা, দেয়ালে রং করাসহ ময়দানকে জামাতের উপযোগী করা হচ্ছে। কাজ রয়েছে শেষের দিকে।
সংস্কার করা হয়েছে অজুখানা ও শৌচাগার। তবে গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে শহরে। এ কারণে মাঠের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে গেছে। বৃষ্টির পানি যেন না জমে, সেজন্য মাঠে ফেলা হচ্ছে বালু।ঠিকঠাক করা হচ্ছে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও।
ঈদগাহ পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। প্রস্তুত রাখা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক ও মেডিক্যাল টিম।
জেলা পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৬ সলের ঈদুল ফিতরে রক্তাক্ত জঙ্গি হামলার পর থেকে শোলাকিয়া ঈদের জামাতে নিরাপত্তার দিকটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা নিয়ে মুসল্লিদের মধ্যে যেন কোনো অস্বস্তি না থাকে, সেজন্য এই ব্যবস্থা।
ঈদ জামাতকে সামনে রেখে এরইমধ্যে জেলা শহরে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঈদের দিন ঈদগাহে মোতায়েন থাকবে দুই প্লাটুন বিজিবি, ছয় শতাধিক পুলিশ, র্যাব, সিআইডি, পিবিআই ও আনসার সদস্য। পাশাপাশি সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। জেলা প্রশাসনের ৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন ঈদগাহ মাঠে।
নিরাপত্তা জোরদারে ঈদগাহ মাঠে বসানো হয়েছে চারটি ওয়াচ টাওয়ার। মাঠজুড়ে বসানো হয়েছে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা। এ ছাড়া ঈদ জামাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চারটি ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। তিনটি আর্চওয়ের মাধ্যমে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করানো হবে। ফায়ার সার্ভিস ও একাধিক মেডিক্যাল টিমও প্রস্তুত থাকবে মাঠে।
ঈদগাহে মুসল্লিরা শুধু জায়নামাজ ও জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। ছাতা, ব্যাগ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্থায়ী অজুখানার পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে অতিরিক্ত অজুখানা। সুপেয় পানির জন্য মাঠের বিভিন্ন স্থানে টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক বসানো হয়েছে। এছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে পর্যাপ্ত অস্থায়ী শৌচাগারও। জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ।মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ঈদগাহ মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে শোলাকিয়ার জামাত ঘিরে এসব প্রস্তুতির কথা জানান ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন। তিনি বলেন, ঈদ জামাত শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পুরো আয়োজনটি সাজানো হয়েছে। তাছাড়া নারীদের জন্য আলাদা জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই জামাতটি হবে সরযুবলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘নারীদের জামাতে ইমামতি করবেন মাওলানা সানাউল্লাহ। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আশা করছি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ জামাত হবে। আর বৃষ্টিবাদল হলে মুসল্লিদের যেন দুর্ভোগ কম হয়, সে ব্যবস্থাও করে রাখা হয়েছে।’
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, নিরাপত্তার দিক থেকে কোনো ঝুঁকি না থাকলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই শোলাকিয়ায় প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। মাঠ ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে শান্তিপূর্ণ ঈদ জামাত। তা করতে গিয়ে যা যা করা দরকার, সবই কিছুই করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করে পুলিশ সুপার বলেন, মুসল্লিরা কেবল জায়নামাজ নিয়ে মাঠে প্রবেশ করবেন। এরই মধ্যে মাঠসহ পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। নিশ্চিদ্র ও কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের পাশাপাশি মাঠে সাদা পোশাকে নজরদারি করা হবে। নামাজ শুরুর আগে বোম্ব ডিসপোজাল টিম মাঠ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। তাছাড়া শোলাকিয়া মাঠ ও শহরের সব অলিগলিতে বসানো হবে নিরাপত্তা চৌকি।
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ঈদের দিন শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতে আসা মুসল্লিদের জন্য দুটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে। সকাল ৬টায় ভৈরব থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। পরে এ ট্রেনটিই দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ভৈরবের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। এ ছাড়া আরেকটি বিশেষ ট্রেন ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌঁনে ৬টায় ছেড়ে এসে সকাল সাড়ে ৮টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে। পরে এটি আবার ময়মনসিংহের উদ্দেশে কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করবে দুপুর ১২টায়।শহরের পূর্ব-দক্ষিণে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত শোলাকিয়া মাঠ। এর আয়তন সাত একর। প্রায় ২০০ বছর ধরে এই মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে। স্থানীয়রা জানায়, শোলাকিয়ার সাহেববাড়ির সুফি সৈয়দ আহম্মদ ১৮২৮ সালে তার নিজের জমিতে ঈদ জামাতের আয়োজন করেন। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য বলছে, ঈদের প্রথম জামাতে সোয়া লাখ মুসল্লি অংশ নেন। পরে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়া এবং সেখান থেকে শোলাকিয়া শব্দটি প্রচলিত হয়েছে।
রেওয়াজ অনুযায়ী শোলাকিয়ায় ঈদ জামাত শুরুর পাঁচ মিনিট আগে তিনটি, তিন মিনিট আগে দুটি ও এক মিনিট আগে একটি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। এটি নামাজ শুরু করার সংকেত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।