অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি কোন দলের প্রার্থী—তা মুখ্য নয়। দুর্নীতি যে-ই করুক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আসিফ মাহমুদ কী কী করেছেন, তা তদন্ত প্রতিবেদনেই প্রমাণিত হবে।’
সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
মীর শাহে আলম বলেন, ‘তিনি যে চ্যালেঞ্জ করেছেন, সেটা তদন্ত রিপোর্টেই প্রকাশ হবে—তিনি কী কী করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু শপথ গ্রহণকারী একজন মন্ত্রী, বাইরের যে কেউ একটা বিষয় নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তো চ্যালেঞ্জ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি গোপনীয় নথি জনগণের কাছে উপস্থাপন করে বলতে পারব না যে, আপনার চ্যালেঞ্জকে আমি এক্সেপ্ট করলাম।’
মীর শাহে আলম বলেন, ‘আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া যে চ্যালেঞ্জ করেছেন, সেই বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনেই প্রকাশ হবে। সেখানে তিনি কী কী করেছেন, তা স্পষ্ট হবে।’
এর আগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সচিবের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন বিলে সই করেছেন বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন মীর শাহে আলম।
এ নিয়ে আসিফ মাহমুদ তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, ‘তিনি যে চ্যালেঞ্জ করেছেন, সেই জিনিসটা আমাদের যে তদন্ত রিপোর্ট আসবে, সেই তদন্ত রিপোর্টেই প্রকাশ হবে যে তিনি কী কী করেছেন এখানে।’
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি যে-ই করুক, সেটা যে দলেরই হোক, সে কোনোভাবেই ছাড় পাওয়া উচিত নয়।’
মীর শাহে আলম আরো বলেন, ‘বিগত সময়ে যারা অন্যায়, অপরাধ করেছে এবং জনগণের অর্থ লোপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘আইনের মধ্যে এবং বিধির মধ্যে থেকে যদি চাকরিচ্যুত করে বিদায় করে দেওয়া যায়, সেটা করা হবে।
যদি আইনের মধ্যে নিয়ে এসে মামলা করে, যদি আইন-আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানাও করার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই দিকেও আমরা যাব এবং সহায়তা করব।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে একটি কমিটি কাজ করছে বলেও জানান তিনি। একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিকে প্রথমে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরো দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, এই তদন্ত প্রতিবেদনেই মন্ত্রণালয়ে কী কী অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তা প্রকাশ হবে।
মীর শাহে আলম দাবি করেন, ‘পিরোজপুরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কোনো কাজ না করেই শুধু টেন্ডারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, বিল প্রস্তুত করে ট্রেজারি থেকে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। কয়েকটি মামলাও হয়েছে এবং মামলার আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
মীর শাহে আলম বলেন, ‘আমি শুধু একটি জেলার উদাহরণ আপনাকে দিলাম। তাহলে চিন্তা করেন, বিগত আওয়ামী লীগের ১৫ বছর বা ১৭ বছর আর এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময় মিলিয়ে দুর্নীতির প্রকোপটা কী রকম হয়েছে, সেটা আমাদের তদন্ত রিপোর্টে বের হয়ে আসবে।’
এ সময় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাবশালী ঠিকাদারদের প্রভাব বিস্তার ও বিভিন্ন জায়গায় কাজের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করার বিষয়েও কথা বলেন তিনি। এসব বিষয়ে সরকার নজর রাখছে জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্টের নিয়ম ও সংশ্লিষ্ট অর্ডিন্যান্স সংশোধনের জন্য এরই মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে তিনি নিজেও সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। বিদ্যুৎমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানসহ সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বলে জানান তিনি।
মীর শাহে আলম বলেন, পিপিআর সংশোধন এমন পর্যায়ে নেওয়া হচ্ছে, যেন ভালো ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও বিক্রেতারা সরকারের কাছে পণ্য সরবরাহ এবং নির্মাণকাজে অংশ নিতে পারেন। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সংশোধিত পিপিআর নিয়ে আসা হবে বলেও জানান তিনি।
রাস্তার কাজের গুণগত মান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অভিযোগের বিষয়েও কথা বলেন মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ফেসবুকসহ অনলাইন মাধ্যমে কোনো রাস্তার কাজের মান নিয়ে অভিযোগ এলে তা আমলে নিয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হচ্ছে।
তবে কার্পেটিংয়ের পর নির্ধারিত সময় না দিয়েই রাস্তার কাজ তুলে মান খারাপ দেখানোর বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তার ভাষ্য, একটি কার্পেটিংয়ের পর সেটেল হওয়ার জন্য ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হতে পারে। সেই সময় না দিয়ে দুই ঘণ্টার মধ্যে কাজ তুলে ফেললে সেটিকে নিম্নমানের কাজ মনে হতে পারে।
এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে টেকনিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলো প্রকৌশলীদের কাছ থেকে জেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গ্রামীণ সড়কে কার্পেটিং বা ঢালাইয়ের কাজ নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন ও এস্টিমেট অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা বুঝে নেওয়ার অনুরোধ করেন মীর শাহে আলম।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের সময়ে এসে কাজের গুণগত মান আমরা অনেক ভালো করেছি।’ আগামীতে গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরেজমিনে গিয়ে উন্নয়নকাজের গুণগত মান দেখানোর কথাও জানান তিনি।